হাসপাতাল- এক মূর্তিমান বিভীষিকা| Hospital - statue of fear


 

প্রথম পর্ব


সমীর আর অভিজিৎ দু’জন একসাথেই কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে ডাক্তারি পাশ করেছে। ওদের দু'জনেরই ইচ্ছে প্রত্যন্ত কোনও গ্রামের হাসপাতালে গিয়ে গরীব মানুষের সেবা করা। একদিন ওরা বেরিয়ে পড়লো। শহর থেকে অনেক দূরে এক অজানা প্রত্যন্ত গ্রামে এসে হাজির হল। খুবই নির্জন গ্রামটি। মানুষজনও খুব কম। 



গ্রামের একটু দূরেই একটা পরিত্যক্ত হাসপাতাল আছে। হাসপাতালটা দোতলা। বহু বছর আগে এই হাসপাতালে রোগীদের সেবা হত আর তার সাথে গ্রামের মানুষদেরও অনেক কম পয়সায় চিকিৎসা হত। কোনও এক অজানা কারণে হাসপাতালটি চালু হওয়ার কয়েক বছর পরই বন্ধ হয়ে যায়। সেই থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে ওটা। 



তারা দু’জন এই বন্ধ হাসপাতালটাকেই নতুন করে চালু করার চিন্তা করল। বিকেল তখন প্রায় ঘনিয়ে আসছে। তারা হাসপাতালের নীচের তলায় একটা ঘর পরিষ্কার করল আজকের রাতটা কাটানোর জন্য। প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র গ্রাম থেকে আনিয়ে নিল ওরা। বলা তো যায় না রাতে কখন কি লাগে আর হাসপাতাল থেকে গ্রামের সবচেয়ে কাছের বাড়িটাতে যেতে ১৫ কি ২০ মিনিট সময় লাগবে। তাই আলো থাকতে থাকতেই গ্রাম থেকে জিনিসপত্র আনিয়ে নিল ওরা। সন্ধ্যা হল অন্ধকার নেমে এলো চারদিকে। হাসপাতালের আঙ্গিনায় বসে কথা বলছে সমীর আর অভিজিৎ। তখনই চাদর গায়ে দেওয়া একটা লোক এল তাদের কাছে। তাদেরকে বলল- “এখনও সময় আছে। চলে যান এখান থেকে। জায়গাটা ভালো না।“ সমীর বলল- “কাকু, আমরা ভয় পাই না। কোনও সমস্যা নেই। আপনিও চাইলে আমাদের সাথে থাকতে পারেন।“ তাদের কথা শুনে লোকটা চলে গেল। যাওয়ার সময় বিড়বিড় করে বলে গেল- “কপালে অশেষ দুঃখ আছে আপনাদের।“ লোকটার কথা না শোনার ভান করে আবারও আড্ডা শুরু করলো তারা।




হাসপাতালের দোতলার সবগুলো ঘর তালাবন্ধ। অনেক পুরানো তালায় জং ধরে গেছে। বিল্ডিংটাও খুব পুরানো- দেওয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে। চাঁদের আবছা আলো বিরাজ করছে চারদিকে। সেই আলোয় হাসপাতালের অবয়বটাকে মনে হচ্ছে যেন তন্দ্রাচ্ছন্ন কোন দৈত্য যেকোনো সময় জেগে উঠবে। হাসপাতালের পিছনের গাছগুলো হালকা বাতাসে নড়ছে। পাতাগুলো যেন ফিসফিস করে বলতে চাইছে- "তোমরা চলে যাও, ভালো চাও তো চলে যাও এখান থেকে।"




আড্ডা মারতে মারতে কখন যে রাত সাড়ে ১০টা বেজে গেছে টেরই পেল না তারা। গল্প শেষে রাতের খাবার খেয়ে শুয়ে পড়লো। সবেমাত্র ঘুম লেগেছে ওদের চোখে, এমন সময় হাসপাতালের দোতলা থেকে চিৎকার-চেচাঁমেচি আর মানুষের পায়ের আওয়াজ তাদের কানে ভেসে আসতে লাগলো। খুবই অবাক হল ওরা এই শব্দ শুনে। দোতলার সবগুলো ঘরই তো তালাবন্ধ। তাহলে আওয়াজ আসছে কি করে? হাতে টর্চলাইট নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠল ওরা। দোতলায় উঠে দেখল যে সবকটা ঘরেরই তালা খোলা। একটা ঘরের ভিতর মোমবাতি আর হ্যারিকেন দিয়ে কৃত্রিম আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। তিনজন নার্স একজন রোগীকে ধরে রেখেছে কিন্তু ওদের দিকে তাকাচ্ছে না কেউ। রোগীটা চেচাঁচ্ছে আর বলছে “আমাকে বাচাঁও। ওরা আমাকে মেরে ফেলল গো! আমাকে বাঁচাও।“ এই দৃশ্য দেখে ভয়ে হাত-পা কাঁপতে লাগলো সমীর আর অভিজিৎ-এর।




অভিজিৎ একটু এগিয়ে গিয়ে কাঁপা কন্ঠে বলল- “ওকে ধরে রেখেছেন কেন আপনারা?” ঘাড় ঘুড়িয়ে অভিজিৎ-এর দিকে তাকালো নার্স আর রোগীটা। ওদের চেহারা দেখে মুহূর্তের মধ্যেই সেখানেই অজ্ঞান হয়ে গেল অভিজিৎ। সমীর কোনওরকমে টেনে অভিজিৎকে সেই ঘর থেকে বের করল। সেখান থেকে বের হতেই সবকিছু আবার আগের মত হয়ে গেল। এখন আর কারও কোনও আওয়াজ নেই। ঘরগুলোও তালাবন্ধ। জলের কয়েকটা ছিটে দিতেই জ্ঞান ফিরল অভিজিৎ-এর কিন্তু ভয়ে হাত-পা কাপঁছে তার। হঠাৎ নীচের তলা থেকে এক বিকট চিৎকার শোনা গেল। ওরা দৌড়ে নীচে গেল আর দেখলো মাটিতে উপুড় হয়ে পড়ে আছে সন্ধ্যাবেলা চাদর গায়ে দিয়ে আসা সেই লোকটা। মাথা ফেটে ফিনকি দিয়ে গলগল করে অঝোর ধারায় রক্ত বের হচ্ছে।




সমীর অভিজিৎকে বলল- “তাড়াতাড়ি যা, আমার ব্যাগ থেকে ব্যান্ডেজ আর ওষুধ নিয়ে আয়। অনেক রক্ত বের হচ্ছে। এরকম চলতে থাকলে আর বেশীক্ষণ প্রাণে বাঁচা মুশকিল।“ অভিজিৎ গিয়ে ব্যাগে ব্যান্ডেজ খুজেঁ পেল না। সমীরকে ডেকে বলল- “একটু এদিকে আয় তো ভাই, ব্যান্ডেজ আর ওষুধ খুঁজে পাচ্ছি না।“ সমীর লোকটাকে ওখানে রেখেই অভিজিৎ-এর কাছে গেল আর ব্যাগের ভেতর থেকে ব্যান্ডেজ নিয়ে ফিরে এসে দেখলো সেই লোকটা আর সেখানে নেই। তার চেয়েও অবাক করা বিষয় হল সেখানে কোনও রক্ত বা রক্তের সামান্য দাগও নেই। ভয়ে হাত-পা অবশ হয়ে গেল ওদের। তখনই আবারও চিৎকার-চেঁচামেচি ভেসে আসতে লাগলো দোতলা থেকে। ওরা উপরের দিকে তাকিয়ে দেখলো আবারও আলো জ্বলছে দোতলার ঘরগুলোতে আর ভেসে আসছে সেই রোগীর আর্তনাদ- “আমাকে বাচাঁও।“ আর সহ্য করতে পারল না ওরা। এক দৌড়ে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে গেল। রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে হাঁফাতে লাগলো দুজনেই। হঠাৎ দেখলো একটা লোক ওদের দিকেই হেঁটে আসছে। রাত তখন প্রায় সাড়ে তিনটে। ওরা ভাবতে লাগলো এত রাতে এই লোকটা এখানে কি করছে!




লোকটা ওদের কাছাকাছি আসতেই রক্ত জল হয়ে গেল দুজনেরই। এ যে সেই চাদর গায়ে দেওয়া লোকটা। আবারও দৌড় দিল ওরা। এবার সোজা ওদের ঘরে। দরজা জানালা বন্ধ করে চুপচাপ বিছানায় শুয়ে রইল ওরা। ওপরতলা থেকে চিৎকার-চেঁচামেচি আর মানুষের পায়ের আওয়াজ ক্রমাগত ভেসে আসতে লাগলো। সময় আর যেন কাটতেই চাইছে না। ওরা বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে কখন ভোর হবে এই আশায়। হঠাৎ কে যেন ওদের দরজায় টোকা দিতে লাগল কিন্তু ওরা ওদের জায়গা থেকে একচুলও নড়লো না। বেশ কিছুক্ষণ পর দরজায় টোকা মারা বন্ধ হয়ে গেল। চারদিক নিস্তব্ধ, দোতলা থেকে কোনও আওয়াজ আসছে না। তখনই ঘটলো সেই অঘটনটা। সমীর দেখতে পেলো যে ওদের ঘরের দরজার নীচ দিয়ে রক্ত ঢুকছে। আস্তে আস্তে বাড়তে লাগলো রক্তের প্রবেশ গতি। কিছুক্ষণ বাদে ঘরের পুরো মেঝে রক্তে ভরে গেল। এই ভয়ানক দৃশ্য দেখে তাদের মনে এক অজানা আশঙ্কা চেপে বসল।