পতির পুণ্যে সতীর পুণ্য পর্ব ২| A Wife's Virtue is In Husband's Virtue Chapter 02


 

কুমুদের চিৎকারে ঘুম থেকে ধরফরিয়ে উঠে বসে কানাই। দৌড়ে আসে কুমুদের মা আর ঠাকুমাও।

"কীরে মেয়ে, কী হয়েছে? অমন করে চেঁচিয়ে উঠলি?" জিজ্ঞাসা করে ঠাকুমা।

কুমুদ কিছু বলবে কী, ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। সনকা মেয়ের কাঁধে হাত রেখে বলে, "কী হয়েছে মা? চেঁচিয়ে উঠলি কেন?"



"হ্যাঁ?.." কুমুদ মায়ের দিকে তাকায়। তারপর বাবার গলার দিকে তাকায়। কই, ঠিকই তো আছে সব। তাহলে যে কাটা দাগ দেখলো কুমুদ। মনের ভুল!

"দিল ঘুমটা ভাঙিয়ে। ধুর!" বিরক্তি প্রকাশ করে কানাই।

"তুই শুয়ে পড় আবার।" কুমুদের ঠাকুমা বলে।



"একবার ঘুম ভেঙে গেলে চট করে আবার ঘুম আসে কখনও! শোওয়াটাই বেকার করে দিল।" একরাশ বিরক্ত নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় কানাই।

"এমন মেয়ে, বাপটাকে শান্তি করে দু'দণ্ড ঘুমোতেও দেবে না!" ঠাকুমা গজগজ করতে করতে চলে যায়।

"কী হয়েছিল মা? অমন চেঁচিয়ে উঠলি কেন তখন?" সনকা জিজ্ঞাসা করে।

"না, কিছু না।" কুমুদ চুপ করে যায়।



"কই রে, কোথায় গেলি সব?"

হইহই আওয়াজে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে কুসুম।

"মণি?" খুশিতে মুখখানা ভরে যায় কুসুমের। দৌড়ে বাড়ির ভেতরে চলে যায় আবার।

"মা মা, শিগগির এসো। মণি এসেছে।"

ততক্ষণে দাওয়ার এসে নিজেদের তল্পিতল্পা রাখে যমুনা।



"আরে, ঠাকুরঝি যে!" একমুখ বিস্ময় নিয়ে কুসুমের সঙ্গে বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে সনকা।

"আয় রে, বোস এখেনে।" ছেলেদের উদ্দেশ্যে বলে বৌদিদির দিকে আড়চোখে তাকিয়ে যমুনা বলে, "এতো অবাক হচ্ছ কেন? হুট করে এসে বিপদে ফেললাম নাকি তোমাদের?"

সনকা অপ্রস্তুতের হাসি হেসে বলে, "ছি ছি, বিপদে ফেলবে কেন! আগে থাকতে খবর দিয়ে রাখলে তোমার দাদাকে দিয়ে ভালো মাছ আনিয়ে রাখতাম। এতো বেলায় তো আর কিছুই পাবে না বাজারে।"

"কাল খাইও। এখন তো দু'দিন রয়েছি। দাদাকে বলবে বড়ো দেখে মাছ আনতে। আমার ছেলেরা কাঁটাওলা মাছ খেতে পারে না। ওবাড়িতে অভ্যেস নেই তো!"



জিনিসপত্র নিয়ে ছেলেদের সঙ্গে করে বাড়ির মধ্যে চলে যায় যমুনা।

হাত পা ধুয়ে পরিষ্কার কাপড় পরে যমুনা একটা বাক্স নিয়ে আসে। দাদার দুই মেয়ে আর ছেলেটাকে ডেকে বলে, "দেখ তোদের জন্য কেমন বড়ো বড়ো সন্দেশ এনেছি। এখন একটা করে খা, পরে বাকিগুলো খাবি। দেখিস আবার, সবগুলো খেয়ে ফেলিস না যেন। বাবা, মা আর ঠাকমার জন্য রাখিস।"

রান্নাঘরে গিয়ে সনকার কাছে বসে যমুনা। সনকা ভাত চাপিয়েছে, ডিমের তরকারি হয়ে গেছে।

"তা হ্যাঁগো বৌদিদি, এদিককার খবর কী?"

"খবর আর কী, ওই চলে যাচ্ছে সকলের।" কাজ করতে করতে বলে সনকা।



কুমুদ ঘুরঘুর করছিলো। ফস করে বলে ফেলে, "জানো তো মণি, পুটুর মা না ওর বাবার গলা কেটে দিয়েছে।"

সনকা বিরক্ত হয় মেয়ের উপর, "তুই কী করছিস এখেনে? যা কুসুমের সঙ্গে খাবার জায়গাটা পরিষ্কার কর, খেতে দেবো একটু পরে।"

কুমুদ চলে যায়। যমুনা চোখ গোলগোল করে বলে, "সত্যি নাকি গো? তা বলছিলে না কেন আমায়?"

"কী বলবো বলতো এসব কথা! তুমি দু'দিনের জন্য এসেছো। এসব খবর শুনে কী করবে।"

"তাতে কী হয়েছে! বলো বলো, কী হয়েছিল।"



বাধ্য হয়ে সনকাকে ঘটনাটা বলতে হয়। সবটা শোনার পর যমুনা বলে, "না বাবা। আমার শ্বশুরবাড়িতে আমার খুব খাতির। আর হবে নাই বা কেন! দুই ব্যাটার মা আমি!"

সনকা চুপচাপ নিজের কাজ করে যায়।

সন্ধ্যেবেলায় মায়ের সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করার পর কুমুদদের ডাকে যমুনা। বলে, "কীরে, মণির সাথে একটু গল্প কর। একদিন বাদেই তো চলে যাবো।"

কুমুদ বলে, "একটা গল্প বলো না মণি। কতোদিন তোমার গল্প শুনিনি।"

"কীসের গল্প শুনবি?"

"যা খুশি।"

যমুনা একটু ভেবে বলে, "দাঁড়া, তোদেরকে কানি বউয়ের গল্প বলি।"

সবাই নড়েচড়ে বসে। যমুনা শুরু করে..



"আমার শ্বশুরবাড়ির দিককার ঘটনা, বুঝলি তো? অনেকদিন আগে আমার শ্বশুরবাড়ির গ্রামে মতিন বলে একটা লোক ছিল। সেই লোকটার একটা ব্যবসা ছিল, কীসের ভুলে গেছি। খালি লোকসান হতো ব্যবসায়, একবেলা খেয়ে থাকে এমন অবস্থা। তখন লোকটার বউ নিজের সব গয়না বেচে সংসার সামাল দেয়।


এরপর ওদের কপাল ফিরতে আরম্ভ করে। ব্যবসায় লাভের মুখ দেখে। পয়সাকড়ি বেশ ভালই জমতে শুরু করে। একদিন মতিনের বউ তুলসীতলায় সন্ধ্যে দিচ্ছে, মতিন ব্যবসার কাজে দু'দিনের জন্য বেরিয়েছিল। দেখে নতুন বউ নিয়ে মতিন হাজির। ওই দেখে তার বউ চোখ উল্টে মাথা ঘুরে পড়ে যায়।"

কুসুম সাগ্রহে বলে, "তারপর?"



"তারপর আর কী! মতিনের দুই বউয়ের মধ্যে দিনরাত ঝগড়া হতে থাকে। একদিন মতিন রেগেমেগে পুরোনো বউয়ের দিকে খুব জোরে একখানা গেলাস ছুঁড়ে মারে। বউটার একটা চোখ কানা হয়ে যায়। তাকে ডাক্তারের কাছেও নিয়ে যায় না। সারারাত ধরে খুব কেঁদেছিল বউটা। পরদিন পুকুরে ওর লাশ মেলে। এর ক'দিন পর মতিনের লাশও পুকুরে ভাসতে দেখা যায়। তারপর থেকে পুকুরের পাশের রাস্তা দিয়ে ভয়ে কেউ আর যায় না। লোকে বলে, এখনও নাকি মতিনের কানি বউ কেঁদে কেঁদে ওদিকে ঘুরে বেড়ায় আর ধারকাছ দিয়ে কেউ গেলে তার ঘাড়ে চাপে।"



কুসুম বলে, "আর নতুন বউটা?"

"ওর কথা জানি না। বেঁচে গেছিল কী মরে গেছে কেজানে!"

কুমুদ জিজ্ঞাসা করে, "বউটাকে ওরকম মারলো কেন? তাহলে তো আর মরে যেতো না।"

যমুনা একটা হাই তোলে, "মেয়েমানুষের জীবন খুব কঠিন রে মা। ধৈয্য চাই, অসীম ধৈয্য।"

"ঠাকুরঝি এদিকে একবার এসো তো, খাবারগুলো বেড়ে ফেলি.." সনকা হাঁক দেয়।

"হ্যাঁ চলো।" রান্নাঘরের দিকে চলে যায় যমুনা।

কুমুদের কানে বাজতে থাকে, "মেয়েমানুষের জীবন খুব কঠিন রে মা.."



দু'দিন পর..

যমুনা তার দুই ছেলেকে সঙ্গে করে শ্বশুরবাড়ি বিদায় নিয়েছে। বিকালের দিকে গোপা আসে কুমুদের সঙ্গে খেলতে। কুসুমও যোগ দেয় খেলায়। সনকা আর গোপার মা সাবিত্রী দাওয়ায় বসে গল্পে মশগুল।

কিছু পরেই গোপার চিৎকারে চমকে ওঠে সবাই। সনকা আর সাবিত্রী দৌড়ে গিয়ে যায় সেদিকে।

Chapter 3    Chapter 1