পতির পুণ্যে সতীর পুণ্য পর্ব ৩| A Wife's Virtue is In Husband's Virtue Chapter 03


 

সনকা আর সাবিত্রী দৌড়ে গিয়ে দেখে গোপা হাউহাউ করে কাঁদছে। মাকে দেখে আঙ্গুল দিয়ে গোপা দেখায় মাটিতে তার প্রিয় পুতুলটা পড়ে আছে। কিন্তু মুন্ডুটা নেই।


"কী হয়েছে রে?" সাবিত্রী শুধোয় মেয়েকে।
গোপা কাঁদতে কাঁদতে বলে, "কুমুদ ভেঙে দিয়েছে।"
ওই শুনে সনকা তেড়ে গিয়ে ঠাস করে একখানা চড় কষায় মেয়েকে।
"কেন রে? কী এমন হয়েছে যে ওর পুতুলটা ওভাবে ভেঙে দিতে হলো?" সনকা জিজ্ঞাসা করে।


কুমুদ নীচের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। কুসুম বলে, "দিদি আর গোপাদিদি পুতুলের বিয়ে দিয়েছিল। দিদির মেয়ে পুতুল গোপাদিদির ছেলে পুতুলের জন্য রান্না করেছে। গোপাদিদির রান্না পছন্দ হয়নি। তাই বলেছে এই বউটা বাজে। চুমকি দিদির মেয়ে পুতুলের সাথে আবার বিয়ে দেবে ওর ছেলের।"


সনকা রণমূর্তি ধারণ করে বলে, "হতচ্ছাড়ী মেয়ে, এইজন্য ওর পুতুলটা ভেঙে দিলি তুই?"
এবার কুমুদ কেঁদে ফেলে, "আমি কী করলাম! পুটুর মা-ও তো ওর বাবাকে মেরে ফেলেছে। পুটুর বাবা আবার বিয়ে করবে বলেছিল। তাই আমিও ওর মায়ের মতো গলা কেটে দিয়েছি।"


সনকা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সাবিত্রী মেয়েকে বলে, "চুপ কর, আবার তোকে ওরকম একটা পুতুল কিনে দেবো।" কুমুদকে বলে, "কাঁদিস না মা, আমি তোর মাকে বুঝিয়ে বলছি।"
সনকাকে কিছুটা দূরে হাত ধরে টেনে আনে সাবিত্রী।


রাগে দুঃখে সনকার স্বর কেঁপে যায়, "কী করবো বলতো! দেখলি তো! কী করবো এই মেয়েকে নিয়ে!"
সাবিত্রী বোঝায়, "ওইটুকু মেয়ের আর দোষ কী! যা সব ঘটছে আজকাল। বাচ্চারা তো দেখেই শেখে। ওই যে আমার মেয়েটা অমন বললো, ও তো শিখেছে আমার শ্বাশুড়ির কাছ থেকে। কতোবার বলেছি আগে যা বলেছেন, বলেছেন। ছেলেপুলেদের সামনে এসব বলবেন না। কে শোনে কার কথা!"
সনকা তবুও মুখ ভার করে রাখে।



ছয় বছর পর..
"কই গো, কোথায় গেলে? কুটুমবাড়ি থেকে খবর এসেছে, মেয়ে পছন্দ হয়েছে ওদের।" কানাইয়ের কথায় গোটা বাড়িতে খুশির রেশ ছড়িয়ে পড়ে।


কুমুদ এখন সতেরো। রূপে গুণে লক্ষ্মী। কপালদোষে সরস্বতী হতে পারেনি। তবে এই গ্রামের কোনো মেয়েরই সেই ভাগ্য নেই। গ্রামে মেয়েদের যাও বা একখানা স্কুল আছে, অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত। কুমুদের মা বলেছিল, কী আর হবে পড়াশোনা করে! সেই তো কিছুদূর গিয়েই শেষ। কিন্তু ওই অবধিই মন দিয়ে পড়াশোনা করে গেছে কুমুদ। ঘরের কাজকর্ম, রান্নাবান্নাও শিখে গেছে। তার সেই ছটফটে ভাব, চঞ্চলতাও বেশ স্তিমিত। সমবয়সী মেয়েদের তুলনায় কুমুদের গড়ন কিছুটা বাড়ন্ত হওয়ায় বিয়ের জন্য পাত্র খোঁজার এত তাড়া তার বাবামায়ের।


"যাক বাবা, মেয়ে আমাদের ভালো ঘরে গিয়ে পড়ছে।" বলে কুমুদের ঠাকুমা।
"ঠাকুরঝি-কে খবরটা পাঠাই। মিনতি সাবিত্রীদেরও জানাতে হবে.." সনকা উচ্ছ্বসিত হয়।


রান্নাঘর থেকে সব কথাই কানে যায় কুমুদের। মনে মনে খুশি হয়, লজ্জাও পায়। বিয়ের সম্বন্ধে মেয়ের মতামত আছে কিনা কে আর জানতে চায়! তবে তার ভাগ্য ভালো বলতে হবে। ছেলেকে তার পছন্দ হয়েছে। আর তার কারণও আলাদা। ছেলে পড়াশোনা জানে। হিসেবপত্তর, খাতা লেখার কাজ করে। সেও তাহলে বিয়ের পর বরকে বলেকয়ে একটু আধটু লিখতে পড়তে পারবে।


চারমাস অতিক্রান্ত। বিয়ের আয়োজন বেশ ভালই এগোচ্ছে। বেশিদিন বাকিও নেই। যমুনা এসেছে বাপেরবাড়িতে। দাদার মেয়ের বিয়ে বলে কথা! কতোদিন পর কোনো অনুষ্ঠান হবে! অনেক আয়োজন অনেক কেনাকাটা বাকি। শাড়ি কিনতে হবে, তত্ত্ব সাজাতে হবে। এই আলোচনাগুলো সেরে ফেলতে হবে তো! না এলে হয়! বৌদিদি একা আর কতো করবে!


"তা হ্যাঁরে কুমুদ, বিয়েতে কী রঙের বেনারসি পরবি?" যমুনা জিজ্ঞাসা করে।
কাচা জামাকাপড়গুলো পাট করছিল কুমুদ। পিসির কথা শুনে সলজ্জে মুখ নামিয়ে নেয়।
সনকা বলে, "কী আবার পরবে, লালই পরবে।"


"বৌদিদি শোনো না.." সাগ্রহে বলে যমুনা, "এখন জানো তো লাল ছাড়াও অন্য রঙের বেনারসি পরে সবাই। এই তো আমাদের পাড়াতেই, মানে আমার শ্বশুরবাড়ির পাড়ায় আর কী, চৌধুরীদের বাড়ি আছে না! ওই যে গো, মস্ত বড়ো বাগান যাদের। ওদের ছেলের বিয়েতে দেখেছি। যেদিন বউ এলো, নীল রঙের বেনারসি পরে এসেছিল। তাতে আবার সোনালী সুতোর বুটি বুটি দেওয়া। কী সুন্দর দেখতে শাড়িটা।"


সনকা হেসে ফেলে, "কী যে বলো ঠাকুরঝি, আমরা কী আর চৌধুরীদের মতো অতো বড়ো মানুষ! আমাদের লাল বেনারসিই ঠিক আছে। নিয়ম ভাঙতে গেলে পাঁচজনে পাঁচকথা বলবে। মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে আবার কী বলবে। তার চেয়ে এই ঠিক আছে।"
যমুনা ব্যাজার গলায় বলে, "পরিও তাহলে লাল বেনারসি। তবে আমার শ্বশুরবাড়ির পাড়া থেকে আনিও। আমিই কিনে দেবো নাহয়। মণি বলে কথা! আমাদের পাড়ায় ভালো ভালো দোকান আছে, শহর থেকে নিয়ে আসে শাড়িগুলো।"


এমনসময় কানাই এসে ঢোকে ঘরে।
"এ বিয়ে হচ্ছে না.."
একমুহূর্তের জন্য সবাই স্তব্ধ হয়ে থাকে। সনকা ধেয়ে আসে স্বামীর দিকে, "কী বললে তুমি, কী বললে?"
"এ বিয়ে হচ্ছে না। আমি সম্বন্ধ ভেঙে দিয়ে এসেছি।"


"তুই কি পাগল হয়ে গেলি? এরপর মেয়েটার আর বিয়ে হবে?" যমুনা চেঁচিয়ে ওঠে।
কুমুদের দিকে চোখ পড়ে সনকার। দু'চোখ ছলছল করছে তার।
মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, "তুই পাশের ঘরে গিয়ে বোস।"
কুমুদ চলে যায়।


"হবে না মানে! আরো বড়ো ঘরে বিয়ে হবে আমার মেয়ের। রাজরানী হয়ে থাকবে।" কানাই বলে।
সনকার বিস্ময়ের ঘোর কাটে না, "কীকরে?"
"নতুন সম্বন্ধ এসেছে মেয়ের জন্য। রক্ষেকালী পুজোর দিন মায়ের থানে মেয়েকে দেখেছিল ছেলের মা। খুব পছন্দ হয়েছে ওদের। লোক লাগিয়ে খুঁজে খুঁজে আমাদের ঠিকানা বের করেছে, তারপর আমার সঙ্গে কথা বলেছে। বিশাল অবস্থা ছেলেদের। কই, জল দাও একগেলাস। গলাটা শুকিয়ে গেছে একেবারে।"


"আমি দিচ্ছি.." যমুনা দৌড়ে গিয়ে জল নিয়ে আসে। "তারপর?"
"ওদের গোলাভর্তি ধান, বিঘে বিঘে জমি, কতো লোক ওদের তলায় কাজ করে। বড়ো বাড়ি আছে। মালিক ঘরে বিয়ে হবে মেয়ের।" কানাই গর্বের হাসি হাসে।
সনকা সন্দেহ প্রকাশ করে, "তা এতো বড়ো মানুষ, তারা আমাদের মেয়েকে বিয়ে দিয়ে নিয়ে যেতে চায় কেন? আমরা কোনদিক থেকে ওদের সঙ্গে সমান সমান?"


"আচ্ছা মা তো তুমি! কোথায় এমন খবরে খুশি হবে, হিসেব কষতে বসেছো! কেন আবার কী! বললাম তো, মেয়েকে দেখে ছেলের মায়ের মনে ধরেছে।"
যমুনা শুধোয়, "ছেলেদের বাড়ি কোন গ্রামে?"
"বাকি সব কথা পরে হবে। আগে নেয়ে আসি। অনেকক্ষণ পেটে কিছু পড়েনি। খাবার বাড়ো, আমি চট করে আসছি।" ঘর থেকে বাইরে পা বাড়ায় কানাই।
যমুনা সামনে এসে দাঁড়ায়, "ছেলের বাড়ি কোথায়?"
কানাই বিরক্ত হয়, "বললাম তো সেসব কথা পরে বলছি!"
"না, আগে বল, তারপর নাইতে যা।" স্থিরদৃষ্টিতে দাদার দিকে তাকিয়ে বলে যমুনা। ওভাবে দেখে সনকার বুকের ভেতরটা এক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে।


"মেহুলগঞ্জে.." বলে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় কানাই।
"মেহুলগঞ্জ!!" যমুনা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
সনকার আর দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতা থাকে না, ধপ করে বসে পড়ে মেঝের উপর।

Chapter 2 Chapter 4