পতির পুণ্যে সতীর পুণ্য পর্ব ৪| A Wife's Virtue is In Husband's Virtue Chapter 04



কানাই স্নান সেরে এসে দেখে সনকা আর যমুনা চুপচাপ বসে আছে। বিরক্ত হয়ে বলে, "এখনও বসে আছো? বললাম না ভাত বাড়তে!"


সনকা স্বামীর দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, "এ বিয়ে হবে না। ওদের বারণ করে দাও।"
কানাই মাথা মুছতে থাকে, "হবে না বললেই হলো! আমি ওদের কথা দিয়ে এসেছি।"
সনকা বলে, "সে তো আগের সম্বন্ধতেও কথা দিয়ে এসেছিলে।"


কানাই এবার সুর নরম করে, "কেন যে তুমি বুঝতে চাইছো না, এটা আগেরটার মতো নয়।"
যমুনা সন্দিগ্ধ গলায় বলে, "সেটাই তো জানতে চাইছি। এই সম্বন্ধটা আলাদা কিসে, যে তোর ওই গাঁয়ে মেয়ে পাঠানোর এতো তাড়া!"
"বললাম তো, ওদের অনেক টাকাপয়সা, জমিজমা.."
যমুনা বলে, "আসল কথা বল।"


কানাই চৌকির উপর বসে একটু চুপ করে থেকে বলে, "এদের কোনো দাবিদাওয়া নেই, বরং ওরাই অনেককিছু দেবে। আমাদের যে জমিটা বাঁধা পড়ে আছে ওটাও ছাড়িয়ে দেবে বলেছে। শুধু তাই নয়, নগদ টাকা দেবে। মেয়েকে সোনা গয়নায় মুড়ে রাখবে। আর কী চাই!"
যমুনা দাদাকে বলে, "তুই জানিসনা ও গাঁয়ে কী হয়? এভাবে মেয়েটাকে বেচে দিচ্ছিস!"


কানাই রাগে লাফিয়ে ওঠে, "খবরদার! আর একবারও যদি এমন শুনেছি! মেয়ে বেচছি আমি! কাদের জন্য করছি এসব! সকলের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই তো করছি। এই মেয়ের বিয়েতে সব দিয়ে থুয়ে দিলে পরেরটার বিয়েতে কী করবো? আরেকটা ছেলে আছে আমাদের। তার ভবিষ্যত কী হবে? কেউ কখনো ভেবেছো?"


সনকাও চিৎকার করতে থাকে, "দরকার নেই। এখন যেভাবে আছি সেভাবেই থাকবো। একবেলা খেয়ে থাকবো তাও ঠিক আছে, তাতে মেয়ে আইবুড়ো থাকুক। কিন্তু ওই গাঁয়ে মেয়ে পাঠাবো না।"
যমুনাও সমর্থন করে, "ঠিক বলেছে বৌদিদি.."
তার কথা শেষ করতে না দিয়েই দাঁত কিড়মিড়িয়ে ওঠে কানাই, "তুই এত কথা বলার কে? তুই কুমুদের মা না বাপ? বছরে দু'বার আসিস, শ্বশুরবাড়ির পয়সার গরম দেখাস, চলে যাস। তুই কী বুঝবি অভাবে থাকা কাকে বলে! দাদার কথা ভেবেছিস কখনও? এলেই খালি বড়ো মাছ চাই। দূর হ', এক্ষুনি বিদেয় হ' এখেন থেকে।"


দাদার কথা শুনে যমুনা স্তব্ধ হয়ে যায়। রাগে অপমানে লজ্জায় চোখ ফেটে জল আসে। দৌড়ে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। ওই দেখে সনকাও ননদের পিছু পিছু ছোটে। পাশের ঘরে গিয়ে দেখে যমুনা বাক্সের মধ্যে জামাকাপড় গুছোচ্ছে।
"অমন করে চলে যেও না ঠাকুরঝি। তুমি ছাড়া আমার আর আছেটা কে বলো! তুমিও যদি মুখ ফিরিয়ে নাও, কার কাছে যাবো আমি! লক্ষ্মী বোনটি আমার।"


যমুনা চোখ মুছে বলে, "দেখলে তো বৌদিদি, দাদা কেমন করে বললো। এরপর আর থাকি কীকরে বলো!"
সনকা কাতরকন্ঠে অনুরোধ করে, "ওভাবে বোলো না ঠাকুরঝি। দাদাই কী সব! তোমার মা, তোমার ভাইপো ভাইঝিরা, তোমার বৌদিদি কেউ নয় তোমার! তুমি চলে যেও না বোন।"


এমনসময় কুমুদের ঠাকুমা ঘরে ঢোকে।
"কী হয়েছে রে? কানাইটা এতো চেঁচাচ্ছে কেন?"
যমুনা একটা সুযোগ পেয়ে যায়, মা বললে যদি দাদা শোনে।
"আর বলো কেন মা, দাদা কুমুদের বিয়েটা ভেঙে দিয়ে এসেছে। নতুন সম্বন্ধ করেছে। কোথায় জানো? মেহুলগঞ্জে। মেহুলগঞ্জ, বুঝতে পারছো?"


কানাইয়ের মা কিছুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে থেকে ঘর থেকে বেরিয়ে সবে ছেলের কাছে যেতে যাবে, এমনসময় কানাই নিজেই ঘরে ঢোকে।
"আর একটা কথাও শুনবো না কারুর মুখে। যাদের পছন্দ নয় তাদের এই বিয়েতে থাকতে হবে না। আর কেউ যদি বাধা দিতে আসো তার হাত পা বেঁধে রেখে কুমুদের বিয়ে দেবো আমি। এ বিয়ে হবেই।"


ছেলের রণমূর্তি দেখে কিছু বলে ওঠার সাহস পায় না কুমুদের ঠাকুমা। যমুনার দিকে তাকিয়ে কানাই বলে, "তুই এখনও যাসনি! যা এক্ষুনি। বাক্সপ্যাঁটরা নিয়ে বিদেয় হ'।"
যমুনা একটা কথাও না বলে সব গুছিয়ে তার ছেলেদের নিয়ে রওনা দেয়। সনকা আর তাকে বাঁধা দেওয়ার মতো কোনো কথা খুঁজে পায় না, তাও ননদের পিছু পিছু যায়। চোখের জলে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে। বাড়ির বাইরে পা রাখার সময় যমুনা ফিসফিসিয়ে বলে, "তুমি ভেবো না বৌদিদি। দাদা আমাকে যা-ই বলুক, এ বিয়ে আমি ভেঙেই ছাড়বো।"


ননদের কথায় কিছুটা ভরসা পায় সনকা। ফিরে দেখে কানাই তার দিকে সন্দেহের চোখে তাকিয়ে। কিছু না বলে সনকা রান্নাঘরে চলে যায়।


বিয়ের দিন যত এগিয়ে আসতে থাকে চিন্তা চেপে বসে সনকার মাথায়। রাতের ঘুম উধাও হয়ে যায়। কই, যমুনা তো কিছু করলো না! বলেছিল বিয়েটা ভেঙে দেবে। কিছুই তো হলো না সেরকম।
একদিন সকালে দু'জন লোক এসে হাজির হয় সনকাদের বাড়িতে। কানাইয়ের নাম ধরে ডাকতে থাকে। কানাই ঘর থেকে তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে আসে।
"আপনারা?" কানাই বলে।


ততক্ষণে সনকা আর কানাইয়ের মা-ও এসে দাঁড়িয়েছে দাওয়ায়।
একজন লোক বলে, "আপনাদের মেয়ের মৃগী আছে? জানাননি তো আগে!"
কানাই আকাশ থেকে পড়ে, "সেকি কথা! না না, আমাদের মেয়ের ওসব কোনো রোগবালাই নেই। বিশ্বেস না হলে আপনারা নিজেরাই খোঁজখবর নিয়ে নিন। এসব ভুয়ো খবর কে দিল আপনাদের?"
লোক দু'জন নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে।


"গিন্নিমা অন্নপূর্ণা মায়ের মন্দিরে পুজো দিতে গিয়েছিলেন। একজন মেয়েমানুষ এসে তাঁকে বলেছে।"
কানাই বলে, "হিংসে হিংসে, বুঝছেন না? আমার মেয়ের এতো ভালো বিয়ে হচ্ছে, সইছে না অনেকের।"
তারপর একটু ভেবে বলে, "সে মেয়েমানুষকে দেখতে কেমন ছিল?"
দ্বিতীয়জন বলে, "তার ঘোমটা দেওয়া ছিল। তবে গিন্নিমা জানিয়েছেন ওই মেয়েমানুষের ডানহাতে কব্জির কাছে একখান আঁচিল আছে। ঘোমটা ধরে ছিল, তখন গিন্নিমা দেখেছেন।"


রাগে কানাইয়ের মুখ রক্তবর্ণ হয়ে যায়। লোক দু'জন চলে যেতে সেও বেরিয়ে পড়ে হন্তদন্ত হয়ে। সনকার মুখ শুকিয়ে যায় ভয়ে।
দুপুর গড়িয়ে বিকালপ্রায়, কানাই ফেরে। গোটা বাড়ি থমথমে। সনকার রা কাড়ারও সাহস নেই। তার শ্বাশুড়ি মা ছেলেকে বলে, "হ্যাঁরে কানাই, কোথায় গিসলি? সেই কখন থেকে চিন্তা করছি। যেখানে যাস যা, জানিয়ে যাবি তো!"


আগুনে ঘি পড়ার অবস্থা হয়। কানাই তেড়ে উঠে চিৎকার করতে থাকে, "কোথায় আবার যাবো! কোথায় যেতে আমায় বাকি রেখেছো তোমরা! গেছিলাম তোমার গুণধর মেয়ের বাড়িতে। হাতের আঁচিলের কথা শুনেই বুঝেছি বিয়েতে ভাঙচি দেওয়ার কাণ্ডখানা ও-ই বাধিয়েছে। আজ ওর শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে ওদের সবক'টাকে যা তা শুনিয়ে দিয়ে এসেছি। এজন্মে আর এমুখো হচ্ছে না।"


কানাইয়ের মা মুখে আঁচল চাপা দিয়ে কাঁদতে থাকে। অপরাধবোধে সনকার মাথা হেঁট হয়ে গিয়ে মাটিতে মেশে। তার অনুরোধের জন্যই তো এমনটা করেছে যমুনা। শ্বশুরবাড়ির লোকেদের সামনে শুধু শুধু দোষের ভাগী হতে হলো তাকে।


বিয়ের অনুষ্ঠানে অনেকেই আসে না। মেহুলগঞ্জের ছেলের সঙ্গে বিয়ে। যমুনা বা তার শ্বশুরবাড়ির দিক থেকেও আসে না কেউ। স্বল্প লোক সমাগমে স্তিমিত কলরবের মধ্য দিয়ে কুমুদের বিয়ে হয়ে যায়।

বিয়ের অনুষ্ঠানে খুব অদ্ভুতভাবে নতুন বরের মুখ ফুলের ঝালর দিয়ে ঢাকা থাকে। তবে সেসব নিয়ে কেউ কোনো আগ্রহও দেখায় না। মেহুলগঞ্জের এরকমই নিয়ম হয়তো। একটা নিয়ম ইতিমধ্যেই আছে যে বিয়ের কনের সঙ্গে বরের হাতেও মেহেন্দী থাকবে। নকশাকাটা মেহেন্দী নয়, গোল গোল করা। তাই সকলে ভাবে ফুলের ঝালরটাও হয়তো ওরকমই কোনো নিয়ম।


গোল বাঁধে বিয়ের পর খাওয়াদাওয়া হয়ে গেলে। বরপক্ষ দাবি করে তারা এখনই বর কনেকে নিয়ে বিদায় নেবে। এ নিয়ে কানাঘুষো শুরু হয়ে যায়। এমনসময় কানাই এসে ঘোষণা করে বরপক্ষ যা চায় তাই হবে। অগত্যা বিদায়ের তোড়জোড় শুরু করতে হয়।


যাওয়ার সময় মাকে জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কাঁদে কুমুদ। কিন্তু সনকার চোখ থেকে একফোঁটা জল বের হয় না। মেয়ের মাথায় হাত রেখে শীতল কঠিন গলায় বলে, "এখন থেকে ওখানেই তোর জীবন। ওদের কথামত মানিয়েগুনিয়ে থাকিস।"


তারপর কানাইয়ের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে মেয়েকে বলে, "সোয়ামি যেমনই হোক, খারাপ হোক বা ভালো, তার সাথেই থাকতে হবে সারাজীবন। তার যত্নআত্তি করিস। মনে রাখিস, পতির পুণ্যে সতীর পুণ্য।"
বিদায়পর্ব শেষে চোখভরা জল নিয়ে নতুন লোকজনের সঙ্গে শ্বশুরবাড়ি রওনা হয় কুমুদ।

Chapter 5 Chapter 3