পতির পুণ্যে সতীর পুণ্য পর্ব ৫| A Wife's Virtue is In Husband's Virtue Chapter 05



শ্বশুরবাড়িতে এসে ঘোমটার ফাঁক দিয়ে অবাক হয়ে দেখতে থাকে কুমুদ। এতো বড়ো বাড়ি সে আজ অবধি দেখেনি। ফুল দিয়ে আর আলো দিয়ে কী সুন্দর সাজানো! এমনসময় বরণের থালা হাতে নিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায় কুমুদের শ্বাশুড়ি মা।


সম্ভ্রান্ত চেহারা, কিছুটা স্থূলকায়, ধবধবে ফর্সা, কপালে বড়ো লাল গোল টিপ, গলায় চওড়া হার, হাতে মোটা মোটা সোনার বালা, আরো কীসব গয়না, কুমুদ নামও জানে না সেসবের, পরনে লাল পেড়ে তসরের শাড়ি — শ্বাশুড়ি মাকে দেখে মনে একটা শ্রদ্ধাভাব এলেও বেশিটা ঘাবড়েই যায় কুমুদ। বধূবরণ সম্পন্ন হয়ে যাওয়ার পর আরো কিছু আচার অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ করা হয়। মহিলারা একে একে আশীর্বাদ করতে আসে। কুমুদের শ্বাশুড়ি মা গর্ব করে বলে, "কী, তোমাদের কেমন লাগলো নতুন বউ? কেউ বললে নাতো?"


কুমুদের থুতনি ধরে এক বয়স্কা হাসিমুখে বলে, "বেশ হয়েছে, লক্ষ্মীমন্ত মুখখানা। ডাগরডোগর মেয়ে।"
পাশ থেকে আরেকজন মহিলা বলে ওঠে, "এই বউকে ভালোই এনেছো। নয়তো আগেরটা যা রুগ্ন ছিল!"
বিস্ময়ে কৌতূহলে কুমুদের অস্থির দশা হয়। আগেরটা মানে? সে তার স্বামীর দ্বিতীয় স্ত্রী? কই, এসব নিয়ে বাড়িতে কখনও কিছু শোনেনি তো সে! নাকি ইচ্ছে করেই তাকে কিছু জানানো হয়নি?


কুমুদের শ্বাশুড়ি মা বলে, "আজকের এই শুভদিনে ওসব অলক্ষ্মী কুলক্ষ্মীর নাম মুখে এনো নাতো! মরেছে, আপদ বিদেয় হয়েছে। যেক'দিন বেঁচেবর্তে ছিল জ্বালিয়ে মেরেছে আমার ছেলেটাকে।"
সবাই যে যার মতো গল্প করতে থাকে। কুমুদের খুব অস্বস্তি হতে শুরু হয়। এমনসময় তারই বয়সী একটা মেয়ে এসে মিষ্টি হেসে বলে, "ভেতরঘরে চলো বৌমণি। অনেকটা রাত হয়ে গেছে। খাওয়াদাওয়া করে শুয়ে পড়বে।"


রাতে শোওয়ার সময় সেই মেয়েটি আসে কুমুদের সঙ্গে শুতে। হাসিমুখে বলে, "বিয়ের কাজের তো শেষ নেই, তাই তোমার সঙ্গে এতক্ষণে দু'টো কথা বলতে পেলাম। আমার নাম টগর। এ বাড়ির যে খাজাঞ্চিমশাই আছে, আমার বাবা। পাশেই আমাদের বাড়ি। এখানের কোনো উৎসব অনুষ্ঠানে আমিই জোগাড় করে দিই।"


কথা বলার লোক পেয়ে কুমুদ বড়ো খুশি হয়। খুব জানতে ইচ্ছে করে আগের বউয়ের ব্যাপারটা কী। কিন্তু জিজ্ঞাসা করতে কেমন একটা অস্বস্তি বোধ হয়। অগত্যা অন্য কথা বলতে থাকে। তবে বেশি গল্প করে উঠতে পারে না। সারাদিন বিয়ের ধকল, বিয়ে শেষ হতে না হতেই আবার শ্বশুরবাড়ির আসার ধকল, তারপর আচার অনুষ্ঠান, এসবে স্বাভাবিকভাবেই খুব ক্লান্ত ছিল কুমুদ। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ে সে।


পরেরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে লজ্জায় পড়ে যায়। ইস, কতো বেলা হয়ে গেছে। ছি ছি, এবাড়ির লোকজন কী ভাববে। ঘর থেকে বেরোতেই একজন পরিচারিকা দেখতে পেয়ে কুমুদের শ্বাশুড়ি মাকে খবর দেয়। শ্বাশুড়ি মা এসে বলে, "ঘুম ভাঙলো! তা এবার মুখটুখ ধুয়ে নেয়ে নাও, তারপর পরিষ্কার একটা শাড়ি পরো। ঘরে চলো, আমি দেখিয়ে দিচ্ছি।"


ঘরে ঢুকে নিজের বাক্স থেকে লাল ডুরে একখানা শাড়ি বার করে কুমুদ। ওই দেখে শ্বাশুড়ি মা হইহই করে ওঠে, "ওটা বাস্কের মধ্যেই রাখো। এবাড়িতে ওসব জিনিস পরা যাবে না। আমি টগরকে দিয়ে শাড়ি গয়না পাঠিয়ে দিচ্ছি।"
তারপর নিজের মনেই গজগজ করে, "যেমন বাড়ির মেয়ে, তেমন তার শাড়ি গয়না!"


কুমুদ বুঝে উঠতে পারে না যে তার সাজপোশাকে অসন্তুষ্টির কারণটা কী। তার বেনারসিটা বেশ দামী বলেই মনে হয়, গয়নাগাটিও ভালোই পরেছে সে। সেই নিয়ে তার আফসোসের শেষ ছিল না। তার বিয়ে দিতে গিয়ে কতো টাকাপয়সা খরচ হয়ে গেল বাপটার।


কুমুদের শ্বাশুড়ি মা তার মনের কথা বুঝতে পারে। বলে, "তোমার বিয়ের সব খরচা আমরাই দিয়েছি। তোমার শাড়ি গয়না থেকে শুরু করে লোক খাওয়ানো। তোমার বাবার হাত দিয়ে তো জলও গলে না। মেয়ের বাস্কে দু'টো ভালো দেখে শাড়িও পাঠাতে পারেনি। যাকগে যাক, ওরকম কতো শাড়ি আমরা আমাদের বাড়ির কাজের লোকদের দিই।"


কুমুদ আর কিই বা বলবে, চুপ করে শুনে যায়।
কালরাত্রি কেটে যায়, বৌভাতের অনুষ্ঠানও সম্পন্ন হয়। কুমুদের গ্রাম থেকে তার লোকজনেরা আসে। সকলে জিজ্ঞাসা করে জামাই কোথায়, কিন্তু তার আর দেখা পাওয়া যায় না। কুমুদ এই বলে সামাল দেয় যে কাজের বাড়ি, ব্যস্ত আছে। মনে মনে ভাবে লোকে কী দেখবে, সে-ই তো এখনও তার বরকে চেনে না। সকলে কুমুদের সঙ্গে এসে কথাবার্তা বললেও কানাই তার মেয়ের সামনে আসে না।


রাত্রে ঘরে শুতে যায় কুমুদ, টগর নিয়ে যায় তাকে। খুব সুন্দর করে ঘরটা সাজানো হয়েছে। খাট সাজানো হয়েছে ফুল দিয়ে। টগর তাকে বসিয়ে রেখে চলে যায়। দরজাটা ভেজিয়ে দেওয়ার সময় দীর্ঘশ্বাস ফেলে টগর, কুমুদ জানতে পারে না।


একটা অজানা অনুভূতিতে কুমুদের শরীর মন রোমাঞ্চিত হতে থাকে। ভয় ভয় লাগে, খুশিও উপলব্ধি করতে পারে। আজ সে দেখতে পাবে তার স্বামীকে। নয়তো এমন কথা কেউ কখনও শুনেছে, বিয়ের দু'দিন পেরিয়ে গেলো, অথচ বউ তার বরকে চেনে না!


ঘড়ির কাঁটা এগোতে থাকে, কুমুদ প্রতীক্ষা করতে থাকে তার স্বামীর। রাত ঘনায়, কুমুদের দু'চোখ বন্ধ হয়ে আসে ঘুমে। বসে বসে ঢুলে পড়ে, আবার চমকে উঠে যায়। কই, এখনও তো এলো না! শেষে আর থাকতে না পেরে বিছানায় শুয়েই পড়ে কুমুদ, নিমেষের মধ্যে ঘুমিয়েও পড়ে।


মাথায় কারুর হাত বোলানোর অনুভূতিতে কুমুদ এক ঝটকায় উঠে বসে। দেখে টগর দাঁড়িয়ে। হেসে বলে, "উঠে পড় বৌমণি। সকাল হয়ে গেছে। আসলে বেশি দেরি হয়ে গেলে গিন্নিমা আবার কী বলবে তোমায়। তাই আমিই আগ বাড়িয়ে উঠিয়ে দিলাম।"


কুমুদ স্নান করতে চলে যায়। অনেক চেষ্টা করেও জিজ্ঞাসা করে উঠতে পারে না তার স্বামী কোথায়, কাল রাতে আসেনি কেন।
বিবাহপর্ব মিটে যেতে অতিথি অভ্যাগতরা যে যার বাড়ি চলে গেছে। বাড়ির সকলে নিজেদের কাজে ব্যস্ত। কুমুদকে সেভাবে কোনো কাজ করতে হয় না এখানে। বেলার দিকে পায়ে পায়ে ঘুরে গোটা বাড়িটা দেখতে থাকে সে। হঠাৎ করেই শিশুর ক্ষীণস্বরে কান্নার আওয়াজ শুনতে পায়। সেই শব্দ লক্ষ্য করে এগিয়ে গিয়ে দেখে কোণের দিকের একটা ঘর থেকে আওয়াজটা আসছে। ভেতরে ঢুকে দেখে একটা খোপ মতো ছোট্ট খাটে একটা বাচ্চা শুয়ে কাঁদছে, সাত আটমাস বয়স হবে। কুমুদ তাড়াতাড়ি করে বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে নাড়াতে থাকে। তাও বাচ্চাটার কান্না থামে না। কুমুদ বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসে। এমনসময় এক পরিচারিকা দেখতে পেয়ে দৌড়ে এসে কুমুদের কোল থেকে বাচ্চাটাকে নিয়ে চলে যায়। বলে, "খিদে পেয়েছে বলে কাঁদছে, আমি এক্ষুনি খাইয়ে আনছি।"


সন্ধ্যেবেলায় টগর দেখা করতে আসে কুমুদের সঙ্গে। কথায় কথায় কুমুদ বাচ্চাটার প্রসঙ্গ তোলে, জানতে চায় কে ও। টগর একটু চুপ থেকে মৃদুস্বরে বলে, "আমি তোমায় বলছি বৌমণি। কিন্তু এসব কথা কাউকে জানিও না। গিন্নিমা বাড়তি কথা একদম পছন্দ করে না।"
কুমুদ ঘাড় নাড়ে, কাউকে বলবে না।


টগর শুরু করে, "এ বাড়ির দুই ছেলে। বড়ো ছেলের নাম জগদীশ, ছোটো ছেলের নাম প্রতাপ। এই ছোটো ছেলের সঙ্গেই তোমার বিয়ে হয়েছে। দু'বছর আগে বড়ো ছেলের বিয়ে হয়েছিল, তার বউয়ের নাম ছিল বিধুমুখী। সোনার প্রতিমার মতো ছিল সে। কেন যে তার বাবা বিয়ে দিয়েছিল এখানে!" বলেই কুমুদের দিকে তাকিয়ে থতমত খেয়ে যায়। এবাড়িতে মেয়ের বিয়ে তো কুমুদের বাবাও দিয়েছে।


আবার বলতে শুরু করে, "সেই বড়ো বউয়ের মেয়ে কনক, ওই যে বাচ্চাটাকে দেখলে। বেচারীর এমনই পোড়াকপাল, মায়ের ভালোবাসাটাও পেলো না। ওর জন্মের কিছুদিন পরেই বড়ো বউয়ের খুব শরীর খারাপ হয়, বিছানা থেকে উঠতে পারত না। একদিন মরেই গেলো।"


কুমুদ মনে মনে ভাবে, সেদিন তাহলে এই বউয়ের কথাই বলছিল সবাই। বাচ্চাটার জন্য খারাপ লাগে তার।
"আর আমার শ্বশুরমশাই? তাকে তো দেখলাম না!"
টগর বলে, "কর্তামশাই বহুবছর ধরেই নিরুদ্দেশ, অনেক খুঁজেও পাওয়া যায়নি। শুনেছিলাম মাথার ব্যামো হয়ে গেছিলো।"


আরো দু'দিন পেরিয়ে যায়। একা একাই কেটে যায় কুমুদের দিন রাত। কোনো কোনো দিন ভাবে টগরকে জিজ্ঞাসা করেই ফেলবে তার সোয়ামি কোথায়। কিন্তু কেমন একটা সঙ্কোচ হয়, লজ্জা হয়। জিজ্ঞাসা করে উঠতে পারে না সে। মাঝেমধ্যে কনককে নিয়ে খেলতে খুব ইচ্ছে করে। কিন্তু একটু বেশিক্ষণ ওকে কোলে নিলেই কেউ না কেউ এসে ওকে নিয়ে চলে যায়।


পরেরদিন সকালে স্নান করে এসে শোনে বাইরের বড়ো ঘরে খুব হইহট্টগোল হচ্ছে। মাথায় ঘোমটা টেনে পায়ে পায়ে কুমুদ সেখানে উপস্থিত হয়। দেখে সেই ঘরে তার শ্বাশুড়ি মা দাঁড়িয়ে রয়েছে, আরো দু'তিনজন লোক রয়েছে। একজন লম্বা চওড়া চেহারার লোক দাঁড়িয়ে, ধোপদুরস্ত পোশাকআশাক। আর একজন লোক, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ সে, হাতমুখ নেড়ে তার সঙ্গে ঝগড়া করছে।


কুমুদ দেখে লম্বা চওড়া লোকটা তার শ্বাশুড়ি মাকে বলছে, "দেখেছো তো মা, যখনই কাজ সেরে বাড়ি ফিরব এই অশান্তি শুরু হবে। আজ শেষবারের মত বলে দিলাম, আবার যদি এরকম হয় আমি কিন্তু আর কোনো দায়িত্ব নেবো না।"


কুমুদ ভাবে, তার শ্বাশুড়ি মাকে "মা" বলে ডাকছে। এই তাহলে ওর স্বামী।
এদিকে সেই অন্য লোকটাও ছাড়ার পাত্র নয়, স্বর উঁচিয়ে ঝগড়া করেই চলেছে। ভাঙাচোরা গলায় বলে, "আমিও বলে দিলাম মা, দাদা সবকিছুতে আমার উপর খবরদারি করলে আমি শুনবো না। সব সিদ্ধান্ত ও কেন নেবে?"


কুমুদ স্তম্ভিত হয়ে যায়। "দাদা"! মনে পড়ে টগর বলেছিল এ বাড়ির ছোটো ছেলের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে। তারপরেই লক্ষ্য করে সেই তৃতীয় লিঙ্গের লোকটার হাতে বিয়ের মেহেন্দী, যেমনটি তার হাতে আছে। কিছুটা হালকা হয়ে গেলেও একেবারেই অস্পষ্ট নয়। একের পর এক দৃশ্য চোখের সামনে ভাসতে থাকে — বিবাহ আসরে বরের মুখ ঢাকা থাকা, রাতেই বিদায় নেওয়া, বৌভাতের দিনে অনুপস্থিতি, ফুলশয্যায় না আসা, সব সব মিলে যেতে থাকে একে একে। বাবা সব জানতো! তাও!! এমন বাবাও হয়!!


কুমুদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। মনে মনে বলে, "এ কী করলে বাবা! টাকার জন্য একটা হিজড়ের সঙ্গে নিজের মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিলে!"
এক অস্ফুট আর্তনাদ করে জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে কুমুদ।

Chapter 6 Chapter 4