পতির পুণ্যে সতীর পুণ্য পর্ব ৬| A Wife's Virtue is In Husband's Virtue Chapter 06


 

(পূর্ব ঘটনা) বৌভাতের অনুষ্ঠানের রাতে..

কানাই, সনকা, কুসুম, আরো সবাই বৌভাতের অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে পৌঁছোলে কানাই বাকিদের বলে, "তোমরা গিয়ে কুমুদের সঙ্গে কথা বলো, আমি আসছি।"


সনকারা এগিয়ে যায়। কানাই অন্যদিক দিয়ে বাড়ির অন্দরমহলের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। তবে বড়ো ঘরে ঢোকার আগেই এক পরিচারক বাধা দেয় তাকে। কানাই সগর্বে হেসে বলে, "ভেতরে গিয়ে বলুন নতুন বৌরাণীর বাবা এসেছে।"


পরিচারক ভেতর থেকে ঘুরে এসে কানাইকে যাওয়ার অনুমতি দেয়। কানাই গিয়ে দেখে ঘরে একটা খাটের উপর কুমুদের শ্বাশুড়ি মা বসে পান সাজছে।
"বলুন বেয়াইমশাই, কী বলতে এসেছেন?"
কানাই হেঁ হেঁ করে হেসে বলে, "না মানে তেমন কিছুই নয়। এই এসে পৌঁছালাম, ভাবলাম একটু দেখা করে যাই।"


কুমুদের শ্বাশুড়ি মা পানের দিকে মনোযোগ নিবিষ্ট করে শুধোয়, "তারপর বলুন, মেয়ের শ্বশুরবাড়ি কেমন লাগছে?"
"আরে এ তো এলাহী ব্যাপার। মেয়ে আমার এতবড় বাড়ি চোখে দেখেনি কখনও।"


একটু থেমে কানাই বলে, "ইয়ে মানে, জামাই বাবাজীবনকে যদি একবার ডেকে দিতেন। আসলে বিয়ের দিন আংটি দিয়ে আশীর্বাদ করেছিলাম। জামাই বাবাজী কলঘরে যাওয়ার সময় খুলে রেখেছিল মনে হয়, ভুলে ফেলে চলে গেছে। তাই ফেরত দিতে এলাম।"


কুমুদের শ্বাশুড়ি মা না তাকিয়েই বলে, "ভুলে ফেলে আসেনি, ইচ্ছে করেই রেখে এসেছে। আমার ছেলেরা ওসব জিনিস পরে না। দু'দিনেই বেঁকে যাবে, জোলুস চলে যাবে। এখানে তো ওসবের অভাব নেই। ওই আংটি আপনি সঙ্গে করে নিয়ে যান।"


কানাই কিছুটা মনঃক্ষুণ্ণ হয়। বলে, "সে আপনারা যেটা ঠিক মনে করবেন। আমার অনুরোধ, জামাই বাবাজী পরুক না পরুক, নিজের কাছেই রেখে দিক। আশীর্বাদের জিনিস তো, মঙ্গল অমঙ্গলের ব্যাপার আছে।"
"অ, দিন তাহলে। ওই দেরাজের ওপরে রেখে যান।"


"বলছি কী, বাবাজীবনকে যদি একবার ডেকে দিতেন। ওর হাতেই তাহলে দিয়ে চলে যেতাম।"
কুমুদের শ্বাশুড়ি মা এবার মুখ তুলে তাকায়।
"জামাইয়ের হাতেই দিতে হবে? ঠিক আছে, দাঁড়ান। এই কে আছিস, প্রতাপকে ডেকে দে তো।"
একটু পরেই প্রতাপ এসে হাজির হয়। ঘরে ঢুকে মাকে বলে, "বলো, ডাকছিলে কেন?"


কানাই হাসিমুখে পিছন ফিরে জামাইকে শুভ সম্ভাষণ করতে যায়। আগে কখনো জামাইকে দেখার সৌভাগ্য হয়নি তার। বিয়ের কথাবার্তা সব তার মায়ের সঙ্গেই হয়েছে। বিয়ের আগে কয়েকবার জামাইকে দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও কুমুদের শ্বাশুড়ি মা নানা অছিলায় এড়িয়ে গেছে। আর এদের পয়সা প্রতিপত্তির কাছে নিজেকে নগণ্য মনে করে কানাই এ বিয়েতে আপত্তিও জানায়নি কোনো বা সন্দেহও করেনি।


"পান খাবি?" বলে কুমুদের শ্বাশুড়ি মা।
প্রতাপ বলে, "নাহ্। কী বলবে বলো। পানের জন্য তুমি আমায় ডাকোনি।"
"এই যে তোর শ্বশুরমশাই এয়েছেন। কী বলবে তোকে।"
ভুরু কুঁচকিয়ে কানাইয়ের দিকে তাকায় প্রতাপ। কানাই এতক্ষণ বিহবল হয়ে দেখছিল। সম্বিত ফিরতে চিৎকার করে ওঠে, "এ কে? হ্যাঁ? কে এ? না না, এ আমার জামাই নয়। এ আমাদের কুমুদের বর নয়। অনেক ঠাট্টা হয়েছে। আপনি আমার জামাইকে ডাকুন। এক্ষুনি ডেকে পাঠান।"


কুমুদের শ্বাশুড়ি মা গম্ভীর মুখে বলে, "কেউ ঠাট্টা করছে না আপনার সঙ্গে। আপনি আমাদের ঠাট্টার যোগ্য নন। এসব রঙ্গতামাশা বাইরে গিয়ে করুন। আপনাদের মেয়ে এতোদিন খেতে পেতো না, এখানে রাণীর মত থাকবে। আর তাতে আপনার এত নাটক!"


কানাই কেঁদে ফেলে, "এমনটা করবেন না দয়া করে। আমার মেয়েটা শেষ হয়ে যাবে।"
"এখানে নাকিকান্না কেঁদে কোনো লাভ নেই। আপনি তো আর কিছু না জেনেশুনে মেয়েকে এই গাঁয়ে বিয়ে দেননি, সবকিছুই জানতেন। আপনার মেয়ের সঙ্গে কি আমরা জোরজবরদস্তি বিয়ে দিয়েছি!"


"কিন্তু আপনি তো বলেছিলেন অন্যরকম কোনো ব্যাপার নেই। নেহাত আপনাদের গাঁয়ে কেউ মেয়ে দেয় না, তাই টাকাপয়সা দিয়েছিলেন। এসব কিছু তো জানাননি।"
"সে আমাদের ব্যাপার, কোনটা জানাবো আর কোনটা জানাবো না। আপনার নিজেরও তো খোঁজখবর নেওয়ার কোনো গরজ হয়নি।"
"আমি আপনাদের বিশ্বাস করেছিলাম.."


"কেন করেছিলেন? আমরা বলেছিলাম করতে? যাকগে যাক, আপনি এখন আসতে পারেন। আমার ঢের কাজ পড়ে রয়েছে। অনুষ্ঠানের বাড়ি।" বলে কুমুদের শ্বাশুড়ি মা।
কানাই নতমুখে ঘর থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে। প্রতাপ এতক্ষণ কানাইয়ের কথা শুনে মনে মনে রাগে ফুঁসছিল। পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় কানাইকে সজোরে একটা ধাক্কা দিয়ে চলে যায়। মেঝের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে কানাই। নিজেই উঠে ধীরপায়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। কোণের দিকে সিঁড়ির কাছে বসে চোখের জল ফেলতে থাকে। এ কী করলো সে! সবাই তাকে নিষেধ করেছিল এ বিয়ে দিতে, কারুর কথা শুনলো না। এবার মেয়েকে মুখ দেখাবে কীকরে!


বর্তমান সময়..
ধীরে ধীরে জ্ঞান ফেরে কুমুদের, চোখ খুলে তাকায়। পাশে দু'জন পরিচারিকা বসে ছিল। দেখতে পেয়েই একজন দৌড়ে হাঁকতে হাঁকতে বেরিয়ে যায়, "নতুন বৌমণি চোখ খুলেছে, নতুন বৌমণি চোখ খুলেছে!"
কুমুদ বিছানায় উঠে বসে, ঘটনাটা মনে করতে চেষ্টা করে। সবকিছু মনে পড়তেই ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে সে। তার অদৃষ্টেই এমনটা হতে হলো!


এমনসময় ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে প্রতাপ ঘরে ঢোকে।
"আবাগীর বেটি! আমাকে দেখলেই তোদের বাপমেয়ের এতো নাটক! আজ তোকে আমি দূর করে দেবো এবাড়ি থেকে। তোর বাপও তোকে নেবে না। দেখবো তোর খাওয়া জোটে কীকরে। ওই শরীর বেচেই খেতে হবে।"


কুমুদের চুলের মুঠি ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে বাইরে নিয়ে যেতে থাকে প্রতাপ। সকলে ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে চুপচাপ দেখে যায়।
"প্রতাপ, দাঁড়া! ওরকম করিস না। আমি কিন্তু বারণ করছি। আমার কথা না শুনলে কী হবে তুই জানিস!" কুমুদের শ্বাশুড়ি মা এগিয়ে আসে।


প্রতাপের কাছ থেকে কুমুদকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলে, "তুমি ঘরে যাও।"
কাঁদতে কাঁদতে একছুটে ঘরে চলে যায় কুমুদ।
প্রতাপের দিকে তাকিয়ে তার মা বলে, "মেয়েটাকে কিজন্য এবাড়িতে এনেছি ভুলে গেছিস? আমি ওর সঙ্গে কথা বলছি।"


চলে যেতে গিয়েও ফিরে আসে কুমুদের শ্বাশুড়ি মা।
"এখন ওকে আমাদের দরকার। এমনিতেও অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে এ বিয়ের জন্য আমাকে মেয়ে জোগাড় করতে হয়েছে। আবার যদি ওর সঙ্গে এরকম কিছু করতে দেখেছি, এবাড়ি থেকে দূর করে দেবো তোমায়। ওর শরীর বেচে খাওয়ার আগে তোমায় বাড়ি বাড়ি ঘুরে নেচে গেয়ে পেটের ভাত জোটাতে হবে।"


কুমুদের শ্বাশুড়ি মা চলে যায়। প্রতাপ কুমুদের উপর রাগে ফুঁসতে থাকে। এই মেয়েটার জন্য তার অপমানের উপর অপমান হয়ে চলেছে। একে শায়েস্তা না করলে শান্তি নেই।
কুমুদের শ্বাশুড়ি মা ঘরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে কুমুদের সামনে বসে। কুমুদ কেঁদে চলেছে।
"দেখো বাছা, এতে এতো কান্নাকাটি করার কিছু হয়নি। বাপের ঘরে দু'বেলা ভরপেট খেতেও পেতে না, ভালোমন্দ খাওয়া দূরের কথা। এখানে কোনো অভাব আছে তোমার! শাড়ি গয়না যা চাই মুখের কথা খসতে না খসতেই পেয়ে যাবে।"


কুমুদ কিছু বলে না। কুমুদের শ্বাশুড়ি মা বলে চলে, "এই গাঁয়ে প্রতাপকে নিয়ে কারুর কিছু বলার সাহস নেই। কিন্তু আমাদের জ্ঞাতি কুটুমরা আমার ছেলেকে নিয়ে কানাঘুষো করে, কেচ্ছা রটায়। ওদের মুখ বন্ধ করতেই এ বিয়ে। আর তাছাড়া বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে তোমায় কোনো চিন্তা করতে হবে না। জগদীশ আছে তো।"


এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ায় কুমুদ।
"তার মানে?"
পান চিবোতে চিবোতে কুমুদের শ্বাশুড়ি মা বলে, "মানে আবার কী! তোমার বাচ্চার বন্দোবস্ত জগদীশই করে দেবে।"
কথাটার অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে পেরে কুমুদ আর্তনাদ করে ওঠে, "না না, বাচ্চা চাই না আমার। বাচ্চা চাই না।"
"চাই না বললে তো হবে না বাছা। পোয়াতি তো তোমাকে হতেই হবে। তবেই তো সকলে জানতে পারবে যে আমার প্রতাপ পুরুষমানুষ।"


কুমুদের শ্বাশুড়ি মা ঘর থেকে চলে যায়। দুঃখে কষ্টে ভয়ে কুমুদ কাঁপতে থাকে। টগর এসে ঘরে ঢোকে। কুমুদের পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, "শান্ত হও বৌমণি।"
এবার আর পারে না কুমুদ। টগরকে জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কাঁদতে থাকে। কুমুদ অনুরোধ করে, "আজ রাতে তুমি আমার সঙ্গে শুও টগর। আমার খুব ভয় করছে।"


টগর বলে, "আচ্ছা, আমি গিন্নিমার কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে আসছি।"
"উনি রাজি হবে না।"
"বলেই দেখি না একবার।"
টগর গিয়ে কুমুদের শ্বাশুড়ি মাকে বলে, "গিন্নিমা, আজ রাতে আমি বৌমণির সঙ্গে শোবো?"
কুমুদের শ্বাশুড়ি মা বিরক্ত হয়।


"একটা আধবুড়ি মেয়ে, তাকে এতো সামলানোর কী আছে বুঝি না বাপু। আমি বিয়ে করে ন'বছর বয়সে এবাড়িতে এয়েছিলাম।"
টগর বুঝিয়ে বলে, "আসলে সবে সবে এসেছে তো। এ গাঁয়ের নিয়মকানুন কিছু জানে না। তার উপর ছোড়দাদাবাবু অমন করায় আরো ভয় পেয়ে গেছে। একটু সময় দিন, দেখবেন আর কোনো ঝামেলা হচ্ছে না।"


কুমুদের শ্বাশুড়ি মা একটু ভেবে বলে, "ঠিক আছে। তুই তা'লে ক'দিন নতুন বৌয়ের সঙ্গে শো। আর হ্যাঁ, এ গাঁয়ের নিয়মকানুন সব ভালো করে বুঝিয়ে দিবি।"


রাতে ঘুমোনোর সময় কুমুদ অনেকক্ষণ কোনো কথা বলে না। টগরও চুপচাপ শুয়ে থাকে। ঘুম আসে না কারুর। কিছুক্ষণ পরে কুমুদ জিজ্ঞাসা করে, "আচ্ছা টগর, মেহুলগঞ্জের এমন বদনাম কেন? বিয়ের আগে আমার মা, পিসি, ঠাকুমা সকলে বারণ করেছিল এ গাঁয়ে বিয়ে দিতে। সেটা কেন?"
টগর দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
"বলছি।"

Chapter 7 Chapter 5