পতির পুণ্যে সতীর পুণ্য পর্ব ৭| A Wife's Virtue is In Husband's Virtue Chapter 07


 

"এ গাঁয়ে সম্পর্কের কোনো দাম নেই বৌমণি।" টগর বলে।

"তার মানে?"
"এখানকার নিয়ম বড়ো অদ্ভুত। সব ঘরে ছেলে চাই। তাই যদি কেউ দুই ভাই বা তিন ভাই হয় আর তাদের মধ্যে একজনের ঘরে ছেলে জন্মালে আর অন্যদের ঘরে ছেলে না হলে সেই বৌকে অন্যদের ঘরে পাঠানো হয়।"


কুমুদ আঁতকে ওঠে, "সেকী কথা! ভাইয়ের বৌয়ের সঙ্গে সম্পর্ক করতে হবে?"
"হ্যাঁ। এখানের লোকজন ওরকমই বিশ্বাস করে যে এভাবে ছেলে হবে। ওইজন্যই কোনো গাঁ থেকে এখানে তাদের মেয়ের বিয়ে দেয় না।"


"আর যদি সব ভাইয়ের ঘরেই মেয়ে জন্মায়, তাহলে?"
"তখন আবার বিয়ে করে।"
কুমুদ জিজ্ঞাসা করে, "আর আমার শ্বাশুড়ি? তার সাথেও এমন হয়েছে?"
"না, গিন্নিমার সাথে হয়নি। কত্তামশাইরা তিন ভাই, তিনজনের ঘরেই যে যার বৌয়ের থেকে ছেলে হয়েছিল।'


কুমুদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তার কপালখানা তো এমনিতেই পোড়া। তার সোয়ামি আর তাকে বাচ্চা দেবে কীকরে! শেষে কিনা ভাসুরঠাকুর! কুমুদের দু'চোখ জলে ভরে আসে।
টগর বলে, "কেঁদো না বৌমণি। তোমার তো তাও অন্য গাঁয়ে বিয়ে হওয়ার উপায় ছিল, এখানকার মেয়ে নও তুমি। কপালদোষে এখানে এসে পড়েছো। আর আমাদের কথা ভাবো তো, যারা এখানে জন্মেছি! আশপাশের কোনো গাঁ মেহুলগঞ্জের মেয়েদের বৌ করে নিয়ে যায় না। আমাদের জন্ম এখানে, বিয়ে এখানে, মরণও এখানে। এই নোংরা পচা কুয়ো থেকে আমাদের মুক্তি নেই।"


দু'দিন পরের কথা। রাতের বেলায় কুমুদ শোবে বলে বিছানা ঠিক করছে। দরজা ভেজানোর শব্দ হয়। কুমুদ না তাকিয়েই বলে, "টগর এলে?"
এক পুরুষকণ্ঠ বলে ওঠে, "না, আমি।"
চমকে সামনে তাকিয়ে দেখে জগদীশ দাঁড়িয়ে আছে।
"আ-আপনি?" ভয়ার্ত গলায় বলে কুমুদ।
জগদীশ মুচকি হেসে বলে, "এসে থেকে তো তোমার সঙ্গে কথা হয়ে ওঠেনি। তাই দু'টো গল্প করতে এলাম।"
"কাল সকালে কথা বলবেন। আপনি এখন আসুন। অনেক রাত হয়েছে, গিয়ে শুয়ে পড়ুন।"


যাওয়া তো দূরের কথা! জগদীশ ঝপাং করে কুমুদের বিছানায় শুয়ে পড়ে। আধশোয়া হয়ে বিছানায় চাপড় মেরে বলে, "এখানে এসে বসো।"
ভয়ে কুমুদের হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে যায়। পিছু হঠে দাঁড়ায়।
"আরে ভয় পাচ্ছো কেন? এখানে এসো।"
"আপনি চলে যান।"


জগদীশ এবার বিছানা থেকে উঠে কুমুদের দিকে এগিয়ে যায়। তার হাত ধরে টেনে বলে, "এসো।"
কুমুদ এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিয়ে একটা ধাক্কা মারে জগদীশকে। জগদীশ কুমুদের দু'হাত ধরে আরো টানতে থাকে। ধ্বস্তাধ্বস্তি হতে হতে হাত ছাড়িয়ে কুমুদ জগদীশকে সপাটে একটা চড় কষায়।


একমুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায় জগদীশ। তারপরেই রেগে লাল হয়ে যায় সে। কুমুদের চুলের মুঠি ধরে টেনে বিছানায় নিয়ে আসে।
"শালা, হতচ্ছাড়ী মাগী! তোর এতো বড় সাহস আমাকে চড় মারিস! চল, আজ তোর সব তেজ বের করবো।" কুমুদকে ছুঁড়ে ফেলে দেয় বিছানায়।


ওদিকে টগর যথারীতি শুতে চলে আসে। জগদীশ যে আসবে তার জানা ছিল না। দরজা ভেজানো থাকায় ঠেলে ঢুকে ভেতরে দেখে এই কাণ্ড।
মেহুলগঞ্জের নিয়মকানুন ভুলে যায় টগর। দৌড়ে গিয়ে জগদীশের পা জড়িয়ে ধরে, "বৌমণিকে ছেড়ে দাও বড়দাদাবাবু।"


এতে জগদীশ আরো রেগে যায়।
"দু'পয়সার মেয়েমানুষ সব, তোরা আমাকে বলবি আমি কী করবো না করবো? ছেড়ে দেবো ওই মাগীকে? আচ্ছা নে, ছেড়ে দিলাম।"


বলেই ঝুঁকে পড়ে টগরের গলা চেপে ধরে তাকে উঠিয়ে বলে, "তাহলে তোকে ধরি। হ্যাঁ? আজকে যা করার তোর সঙ্গেই করবো।"
বিছানায় পড়ে পড়ে কুমুদ বিস্ফোরিত চোখে দেখে জগদীশ টগরের গলা টিপে ধরে তাকে প্রায় শূন্যে উঠিয়ে নিজের ঘরে নিয়ে যাচ্ছে। শ্বাস নিতে না পেরে ছটফট করছে টগর। কুমুদ ভাবে, ওভাবে ঘরে নিয়ে যেতে যেতেই দম আটকে টগর মরে যাবে।


কুমুদ ছুটে গিয়ে জগদীশকে এলোপাথাড়ি চড় ঘুষি কিল মারতে থাকে। জগদীশ টগরকে ছুঁড়ে ফেলে দেয় মেঝেতে। ঘুরে দাঁড়িয়ে সজোরে একটা চড় মারে কুমুদকে। মাথা ঘুরে মেঝের উপর পড়ে যায় কুমুদ।
"কী হয়েছে? এতো চেঁচামেচি কীসের?" কুমুদের শ্বাশুড়ি মা এসে হাজির হয়।
জগদীশ রাগে চিৎকার করতে থাকে, "এই মেয়েমানুষের এতো সাহস আমার গায়ে হাত তোলে! ওকে আজ পুঁতে ফেলবো আমি!"


কুমুদের শ্বাশুড়ি মা কুমুদকে বলে, "বলিহারি বাপু! তোমার আর কত সময় লাগবে বলোতো মেয়ে? আমি তো আগেই তোমায় সবকিছু জানিয়ে দিয়েছি।"
তারপর টগরের দিকে ফিরে বলে, "তোকে আর এবার থেকে শুতে আসতে হবে না। বাড়ি যা।"


টগর চলে যায়। ভয়ে কুমুদের গলা শুকিয়ে আসে। তার মানে এবার থেকে সে একেবারে একা। কী হবে এবার!
কুমুদের শ্বাশুড়ি মা ছেলের দিকে তাকিয়ে বলে, "তুই ওকে নিয়ে ঘরে যা।"


কুমুদ ফস করে বলে ওঠে, "আমার মাসিক হয়েছে।"
বিরক্তিতে কুমুদের শ্বাশুড়ি মায়ের মুখখানা ভরে যায়।
"যতসব আপদ! হওয়ার আর সময় পেলো না! নাও, এবার ক'দিনের ধাক্কা। যা, নিজের ঘরে যা।"


জগদীশ চলে যায়। কুমুদের শ্বাশুড়ি মাও চলে যায়।
কুমুদ নিজের ঘরে এসে দরজার ছিটকিনি তুলে ভয়ে কাঁপতে থাকে। একটা কিছু উপায় বার করতেই হবে। কিন্তু কী করবে সে! জগদীশের গায়ে যে কতোখানি শক্তি সে তো দেখতেই পেলো। কোনো দয়ামায়াও নেই। কীভাবে বাঁচবে এদের হাত থেকে!


পরেরদিন কুমুদের শ্বশুরবাড়িতে হইচই পড়ে যায়। শহর থেকে এক মস্ত বড় বাবু আসছে নাকি। জগদীশ খুব চেষ্টা করছে তাকে ব্যবসার অংশীদার করতে। তাহলে তাদের ধনসম্পদ আরো ফুলেফেঁপে উঠবে।


বিকালে কুমুদ কনকের ঘরে যেতে গিয়ে শুনতে পায় একটা ঘর থেকে কথা বলার আওয়াজ আসছে আর তার নাম ধরে কিছু বলা হচ্ছে। কৌতূহলী হয়ে ঘরের বাইরে থেকে শোনে জগদীশ আর প্রতাপ কথা বলছে।
"শর্মাজীর ছেলেকে কোনো না কোনোভাবে রাজি করাতেই হবে। একবার রাজি হয়ে গেলেই ব্যবসার মুনাফা দশগুণ বেড়ে যাবে।" বলে জগদীশ।
"আর রাজি না হলে?" প্রতাপ জানতে চায়।


"সেটাই মুশকিল। সবরকমের ব্যবস্থা রাখতে হবে। খাওয়াদাওয়া, বোতল, মেয়েমানুষ — কোনো সুযোগ ছাড়লে চলবে না। তাও ভালো যে শর্মাজীর ছেলে আসছে। এখনকারের ছোকরা, এসব তার নিশ্চয়ই চলবে। নয়তো শর্মাজী যা খিটকেল!"


"কুমুদকে দিয়েও আমরা খুশি করাতে পারি।" প্রস্তাব দেয় প্রতাপ।
"তুই কী পাগল হলি! আগে আমাদের কাজ হাসিল করতে হবে। এখনই বাজারে বসালে চলবে না।"
"হুমম.. ঠিক আছে, আগে আমাদের কাজ মিটে যাক, তারপর ওই মেয়েমানুষকে বাজারের মেয়েছেলে বানিয়ে ছাড়বো।"


"হ্যাঁ, তখন দেখবো ওর তেজ কোথায় থাকে। তবে ভাবছি এখন থেকে ওকে দিয়ে টোপ দেওয়া শুরু করবো।"
দুই ভাইয়ের কথোপকথন শুনে ভয়ে তটস্থ হয়ে যায় কুমুদ।


তার পরেরদিন শর্মাজীর ছেলে আসে। সকলের সঙ্গে পরিচয়পর্ব সেরে ঘরে বসতে কুমুদের উপর হুকুম দেওয়া হয় জলখাবার নিয়ে যেতে। কুমুদ ঘোমটাটা বড়ো করে খাবারের ট্রে হাতে ঘরে যায়।
"আরে, অতো বড়ো ঘোমটা দিয়েছো কেন? ইনি আমাদের অতিথি। এভাবে মুখ ঢেকে রাখলে ওনাকে অপমান করা হয়।" জগদীশ বলে।


কুমুদ কোনো সাড়া করে না, ঘোমটাও তোলে না।
"ঘোমটা সরাও।" এবার একটু ধমকের সুরে আদেশ করে জগদীশ।
অগত্যা কুমুদকে ঘোমটা তুলতেই হয়। জগদীশ শর্মাজীর ছেলের দিকে ঝুঁকে পড়ে মৃদুস্বরে বলে, "কী মণীশবাবু, পছন্দ হয়?"


সেই যুবক চমকে ওঠে।
"উনি তো আপনার ভাইয়ের স্ত্রী! আপনাদের বাড়ির বউ! এখানে আসার পর আপনার মা পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।"


জগদীশ হাসতে থাকে, "সেটা কোনো ব্যাপার নয়। এখানে এসব চলে। আপনার পছন্দটাই বড়ো কথা।"
পরেরদিন সকালে দুই ভাই আস্ফালন করতে থাকে যে শর্মাজীর ছেলে তাদের ব্যবসার প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে। খুব গালমন্দ করতে থাকে সেই যুবককে। কুমুদ জানে যে এইবারে সে রেহাই পেলেও বিপদ তার কাটেনি। পরেরবার অন্যকোনো বাবু আসবে শহর থেকে। সে কী আর এই শর্মাজীর ছেলের মত তাকে নিস্তার দেবে!


অষ্টমঙ্গলায় কুমুদের শ্বশুরবাড়ি থেকে তাদের পাঠানো হয়নি। গেলে কুমুদকে একা যেতে হতো, প্রতাপ যে যাবে না সেতো বলাই বাহুল্য। এ নিয়ে পাঁচজনে পাঁচকথা বলবে। তাই আর পাঠায়নি। এদিকে হঠাৎই সকালে খবর আসে কুমুদের ঠাকুমা ভীষণ অসুস্থ। অসাবধানতাবশত কলতলায় পড়ে গিয়ে খুব চোট পেয়েছে। কুমুদ কান্নাকাটি শুরু করলে একপ্রকার বাধ্য হয়ে তাকে পাঠানো হয়, সঙ্গে দেওয়া হয় এক পরিচারিকা। তাকে গোপনে নির্দেশ দিয়ে দেওয়া হয় কুমুদের উপর নজর রাখতে আর কুমুদকেও শাসিয়ে দেওয়া হয় যাতে দু'দিনের বেশি না থাকে আর এখানকার কোনো কথা বাপেরবাড়িতে না জানায়।


বাপেরবাড়িতে পৌঁছে মাকে জড়িয়ে ধরে কুমুদ খুব খুব কাঁদে। সনকা কিছু জিজ্ঞাসা করে না মেয়েকে। মনে মনে বলে, "কাঁদ মা, মন খুলে কাঁদ। এতে যদি তোর কষ্টটা একটু কমে। আমি তো কিছুই করে উঠতে পারলাম না তোর জন্য। তুই আমার একমাত্র সন্তান হলে তোকে নিয়ে ঠিক কোথাও পালিয়ে যেতাম। এ বিয়ে কিছুতেই হতে দিতাম না। কিন্তু তোর যে আরো দু'টো ভাইবোন আছে, এখানে যে আমার সুতো বাঁধা, যাই কীকরে!"


কুমুদ দেখে যমুনাও এসেছে। কানাই অপমান করে আসার পর থেকে এবাড়িতে আসা সে বন্ধই করে দিয়েছিল। এখন তার মা অসুস্থ, না এসে পারে কীকরে!
রাতে শুতে গিয়ে কুমুদ বলে, "আচ্ছা মণি, তোমার মনে আছে, ছোটবেলায় তুমি একবার আমাদের কানি বউয়ের গল্প (দ্বিতীয় পর্বে উল্লিখিত) বলেছিলে? তোমার শ্বশুরবাড়ির গাঁয়ের ঘটনা।"


যমুনা বলে, "তোদেরকে বলেছি কিনা মনে নেই। তবে হ্যাঁ, অনেকে বলে এটা সত্যি ঘটনা।"
"সেই কানি বউয়ের বাড়িটা কোন জায়গায় ছিল বলতে পারবে?"
যমুনা অবাক হয়, "সে জেনে তোর কী হবে?"
"এমনি জানতে চাইছি।" কুমুদ বলে।

Chapter 8 Chapter 6