পতির পুণ্যে সতীর পুণ্য পর্ব ৮| A Wife's Virtue is In Husband's Virtue Chapter 08


 

কুমুদ যমুনাকে বলে, "মণি, আমায় কালকে একবার তোমাদের বাড়িতে নিয়ে যাবে?"

কুমুদ এভাবে হঠাৎ যেতে চাইলে যমুনা অবাক হয়, সাথে মুশকিলেও পড়ে যায়। আজ সকালে সে সবে এলো, মাকে দেখবে বলে। কালকেই চলে যাবে! আবার কুমুদ এমনভাবে বললো বারণও করা যায় না। মেয়েটা ভালোবেসে যেতে চাইলো।


যমুনা হেসে বলে, "কেন যাবি না! নিশ্চয়ই যাবি।"
"তাহলে কাল দুপুর দুপুর বেরিয়ে পড়বো। পরশু সকালে চলে আসতে হবে। আমায় আবার বিকেলের মধ্যে শ্বশুরবাড়ি যেতে হবে।" ম্লানমুখে বলে কুমুদ।


যমুনার শ্বশুরবাড়ির লোকজনেরা ভালো মানুষ, ভদ্র ব্যবহার। যত্নআত্তির কোনো খামতি রাখে না। কুমুদের বাবা তাদের অমনভাবে অপমান করলেও কুমুদের সঙ্গে সকলে ভালো ব্যবহার করে। মেহুলগঞ্জে বিয়ে হয়েছে শুনে কেউ কেউ দীর্ঘশ্বাসও ফেলে গোপনে।


নিস্তব্ধ নিঝুম রাত, সকলে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কুমুদ সন্তর্পণে ওঠে, পা টিপে টিপে নিঃশব্দে ঘরের বাইরে বেরোয়। আগে থাকতেই পরিকল্পনা করে দরজায় ছিটকিনি দেয়নি, খুলতে গিয়ে যদি শব্দ হয়।
সঙ্গে একখানা হ্যারিকেন নিয়ে যমুনা যেমনটা বলেছিল ঠিক সেইভাবে রাস্তা মিলিয়ে মিলিয়ে কুমুদ হাঁটতে থাকে। কিছুটা গিয়ে ডানহাতে পড়ে ইস্কুল বাড়ি, সেখান থেকে এগিয়ে লালচে রঙের দোতলা বাড়ি। তারপর একটা মাঠ, পাশ দিয়ে সরু রাস্তা। আরো কিছুটা যেতে বুনো ঝোপঝাড় জঙ্গল শুরু হয়। হাঁটতে হাঁটতে একজায়গায় গিয়ে থমকে যায় কুমুদ। ওই তো সেই পুকুরটা যেখানে কানি বউয়ের লাশ ভাসতে দেখা গিয়েছিল।


পুকুরঘাটের চারপাশে জঙ্গল হয়ে গেছে, একদিকটা ভেঙে গেছে। বোঝাই যাচ্ছে কেউ আসে না এদিকে। কুমুদ এবার বুঝে উঠতে পারে না যে কী করবে। ঝোঁকের মাথায় চলে তো এসেছে, কানি বউকে পাবে কীকরে। সত্যি কেউ ওরকম না থাকলে? হয়তো সবই গল্পকথা। কিন্তু এছাড়া তার কাছে আর কোনো উপায়ও তো নেই।


মরিয়া হয়ে কুমুদ ডাকতে থাকে, "কানি বউ, ও কানি বউ, কোথায় তুমি? তোমাকে আমার খুব দরকার।"
কিছুই হয় না। আবার চিৎকার করে বলে কুমুদ, "কানি বউ, তুমি কোথায়? আমার বড়ো বিপদ। তুমি যদি সত্যি থেকে থাকো তো আমার সামনে এসো।"


তবুও কিছু হয় না, কেউ আসে না। কুমুদ কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর হতাশ হয়। নাহ্, আর কোনো উপায় নেই। সারাজীবন ওই নরকেই পচে মরতে হবে তাকে। কানে বাজতে থাকে তার স্বামীর কণ্ঠস্বর, "ওকে বাজারের মেয়েছেলে বানিয়েই ছাড়বো।" কুমুদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে। এই হয়তো ওর ভবিতব্য। ফেরার পথে পা বাড়ায়।


হঠাৎ কেমন একটা খসখস আওয়াজ শুনতে পায়। সাপখোপ নয়তো! আগুপিছু না ভেবে এই অন্ধকারে চলে তো এসেছে। কুমুদ তাড়াতাড়ি পা সরিয়ে নেয়। চারপাশটা কেমন অদ্ভুতভাবে নিশ্চুপ হয়ে আছে, কেমন একটা দমবন্ধ পরিবেশ। গাছের পাতা নড়ছে না, কোনো পশুপাখি পোকামাকড়ের শব্দ পর্যন্ত হচ্ছে না। এতক্ষণে কুমুদের ভয় লাগতে শুরু করে।


দ্রুতপায়ে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে সবে রাস্তায় উঠতে যাবে, নাকে একটা পচা গন্ধ আসে। আওয়াজটা আবার আসতে পেছন ফিরে স্তব্ধ হয়ে যায় সে। আলো আঁধারির মধ্যে আবছায়া একটা অবয়ব, ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসছে। কুমুদ দেখে এক নারীর চেহারা, পরনে ময়লাটে শতছিন্ন একখানা শাড়ি, ভিজে সপসপ করছে। সেই নারীর চেহারা কঙ্কালসার, চোখ সাদা, চুল থেকে টপটপ করে জল পড়ছে।


ওই দেখে ভয়ে কুমুদের মাথা থেকে শ্বশুরবাড়ি, জগদীশ, প্রতাপ সবকিছুর চিন্তা হালকা হয়ে যেতে থাকে। মাথাটা ঝিমঝিম করে ওঠে। নিমেষের মধ্যে জ্ঞান হারায় কুমুদ।
জ্ঞান ফিরলে দেখে ভোরের আলো ফোটার সময় হয়ে এসেছে। হ্যারিকেনটা নিয়ে পড়ি কী মরি করে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে রাস্তা ধরে কুমুদ ছুটতে শুরু করে। কিছুটা দৌড়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। এ কী করলো সে! এভাবে ভয় পেয়ে অজ্ঞান হয়ে গেলো! কানি বউকে তো কিছু বলাই হলো না। এতো বড়ো ভুল করলো সে! তার কাছে এই একটাই সুযোগ ছিল, একজনই ছিল যে তাকে এই পরিস্থিতি থেকে বার করে আনতে পারে। সেই সুযোগ হেলায় হারালো! আর তো কোনো উপায় নেই। আজকে বিকালেই মেহুলগঞ্জে ফিরে যেতে হবে।


তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে যমুনার বাড়িতে পৌঁছে যায় কুমুদ। কেউ উঠে পড়ার আগে হাত পা ধুয়ে পরিষ্কার কাপড় পরে বিছানায় গিয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়ে। ক্লান্ত ছিল, রাতে ঘুমোয়ওনি। শুতেই দু'চোখ জড়িয়ে আসে ঘুমে।
সকালে জলখাবার সেরে পরিচারিকাকে সাথে নিয়ে যমুনার সঙ্গে বাপেরবাড়ি ফিরে আসে কুমুদ। বিকালে মেহুলগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যায়। শ্বশুরবাড়িতে ঢুকতে গিয়ে দেখে দরজার সামনে জগদীশ দাঁড়িয়ে। কুমুদ পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় জগদীশ তাকে ফিসফিসিয়ে বলে, "আজ রাতে আসবো।"


একটা নিরাশা আর মনোকষ্ট নিয়ে নিজের ঘরের দিকে যেতে গিয়ে কুমুদ শোনে কান্নার আওয়াজ। কনক কাঁদছে! ছুটে কনকের ঘরের দিকে চলে যায়। দেখে এক পরিচারিকা কনককে কোলে নিয়ে নাড়িয়ে নাড়িয়ে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু সে কেঁদেই চলেছে। কুমুদকে দেখে সেই পরিচারিকা বলে, "সকাল থেকে খুব জ্বর, কমছেই না। তাই এত কাঁদছে।"


"কোবরেজকে খবর দিয়েছো?" কুমুদ জিজ্ঞাসা করে।
"না মানে, এখনও দেওয়া হয়নি।"
"এখনই কোবরেজকে খবর দাও। আমি হাত পা ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে আসছি।"


কিছুক্ষণ পর কোবরেজ এসে কনককে দেখেশুনে ওষুধ দিয়ে যায়। কুমুদ কনককে বিছানায় শুইয়ে তার পাশে বসে থাকে। কোনোরকমে কনককে একটু খাবার খাওয়ায় কুমুদ, তারপর ওষুধ দেয়। একটু পরে কনক ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুমন্ত বাচ্চাটার মুখের দিকে নির্নিমেষ নয়নে তাকিয়ে থাকে কুমুদ। মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।


কনকের পাশে শুয়ে থাকতে থাকতে ঘুমিয়েই পড়েছিল। আওয়াজ হতে চমকে উঠে পড়ে। দেখে টগর এসেছে। কনক ঘুমোচ্ছে। কুমুদ ফিসফিস করে বলে, "তুমি? তোমায় তো সেদিন আমার শ্বাশুড়ি আসতে বারণ করেছিল। তুমি বাড়ি চলে যাও। আবার কে কী করবে তোমায়। আমার জন্য তোমার কোনো ক্ষতি হয়ে গেলে কিছুতেই মেনে নিতে পারবো না।"


টগর আশ্বস্ত করে, "তুমি কিছু ভেবো না বৌমণি। আমি দোকানে গেছিলাম, ফেরার পথে কোবরেজ মশাইয়ের সঙ্গে দেখা হলো। বললো কনকের খুব জ্বর। তাই চলে এলাম। আজ রাতটা আমি ওর সঙ্গেই থাকবো। মেয়েটা একদম একা তো। তার উপর আবার এতো ছোটো বাচ্চা।"


"তোমার কোনো চিন্তা নেই, আমি আছি তো।"
"আচ্ছা, তুমিও থেকো নাহয়। আমি বাড়ি ফিরে গিয়ে শান্তি পাবো না। বেশ রাত হয়ে গেছে, তুমি খেয়ে এসো। আমি এখানে বসছি।"


কুমুদ খাওয়াদাওয়া সেরে ফিরে আসে। কনকের পাশে শুয়ে সবেমাত্র টগরকে বলেছে, "আমি দু'দিনের জন্য বাপেরবাড়ি গেছিলাম, আজ বিকেলে এলাম.."
দেখে দরজা খুলে জগদীশ ভেতরে ঢুকলো।


"চলো।" কুমুদকে বলে জগদীশ।
কুমুদ ভয়ে সিঁটিয়ে গিয়ে বলেন, "আমি যাবো না। কনকের খুব জ্বর। ওর কাছেই থাকবো।"
জগদীশ বিরক্ত হয়, "টগর আছে তো। দরকার লাগল ঝি চাকরদের ডেকে নেবে। তুমি চলে এসো।"


কুমুদ সাড়া করে না, বিছানা থেকে ওঠেও না। জগদীশ এগিয়ে এসে টেনেহিঁচড়ে কুমুদকে বিছানা থেকে নামিয়ে বাইরে নিয়ে যায়। ঘরের বাইরে বেরিয়ে কুমুদ দেখে তার শ্বাশুড়ি মা আর প্রতাপ দাঁড়িয়ে।
কুমুদের শ্বাশুড়ি মা বলে, "রোজ রোজ এতো ঝামেলা ভালো লাগে না বাপু। আজ রাতের জন্য আমি ঝি চাকরদের ছুটি দিয়ে দিয়েছি। এ মেয়ে যা কাণ্ড করে, লোক হাসানোর কিছু বাকি রাখে না।"


কুমুদ জগদীশকে সজোরে একটা ধাক্কা মারে। টাল সামলাতে না পেরে জগদীশ পড়ে মায়ের উপর গিয়ে। কুমুদের শ্বাশুড়ি মা মেঝেতে পড়ে গিয়ে "বাবারে মারে" করতে থাকে। এসব দেখে রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে প্রতাপ ছুটে এসে কুমুদের চুলের মুঠি ধরে তার মাথাটা দেওয়ালে খুব জোরে ঠুকে দেয়। কুমুদ আর্তনাদ করে ওঠে।


এই হই হট্টগোলের চোটে কনকের ঘুম ভেঙে যায়, কাঁদতে শুরু করে দেয় সে। ঘরের মধ্যে টগর ভয়ে কাঁটা হয়ে বসে থাকে, কনককে চুপ করানোর প্রাণপণ চেষ্টা করে। কিন্তু কনক কিছুতেই থামে না, কেঁদেই চলে।
কনকের কান্নার আওয়াজে কুমুদ সচকিত হয়ে ওঠে, দৌড়ে ঘরে চলে আসে। কুমুদের পেছন পেছন জগদীশ আর প্রতাপও ঘরে ঢোকে। কুমুদ কনককে কোলে নিতে গেলে খপ করে কুমুদের হাতটা ধরে জগদীশ। এতসব ঝামেলার মধ্যে কনক চিলচিৎকার করে কাঁদতে থাকে। জগদীশ রেগে তিতিবিরক্ত হয়ে একখানা বালিশ নিয়ে সজোরে কনকের মুখের উপর চেপে ধরে।


টগর চিৎকার করতে করতে জগদীশকে সরানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে যায়। কুমুদ দেখে বালিশের নীচে কনকের ছোট্ট পা দু'টো ছটফট করছে, এক্ষুনিই হয়তো স্থির হয়ে যাবে চিরকালের মতো। টেবিলের উপর থেকে পেতলের ফুলদানিটা নিয়ে জগদীশের মাথায় খুব জোরে মারে কুমুদ। জগদীশ নিজের মাথাটা দু'হাতে চেপে ধরে মেঝের উপর পড়ে যায়। রক্তে ভেসে যেতে থাকে মেঝে।


প্রতাপ চিৎকার করে ওঠে, "তুই আমার দাদাকে মেরে ফেললি?"
কুমুদের ঘাড়টা চেপে ধরে ঘরের বাইরে নিয়ে আসে প্রতাপ। বেরোনোর সময় কুমুদ দেখে তার শ্বাশুড়ি মা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে জগদীশের রক্তে মাখামাখি দেহের দিকে বিহ্বল হয়ে তাকিয়ে রয়েছে। টগর সভয়ে কনককে কোলের মধ্যে চেপে ধরে বসে থাকে।


প্রতাপ মেঝেতে আছড়ে ফেলে কুমুদকে। তার উপর চেপে বসে দু'হাতে গলাটা চেপে ধরে।
"আজই তোকে আমি শেষ করে ফেলবো।"
কুমুদ প্রাণপণ চেষ্টা করে প্রতাপের হাত ছাড়ানোর। এমনসময় অনুভব করে কে যেন ওর দু'টো পা চেপে ধরেছে। শ্বাশুড়ি মায়ের গলা পায়।
"শেষ করে দে প্রতাপ, এই মেয়েকে শেষ করে দে। আমার ছেলেটাকে মেরে ফেললো। আমি পা চেপে ধরছি, তুই ওর গলা টিপে ওকে মেরে ফেল।"


কুমুদের শরীরটা কেমন যেন করতে শুরু করে, দম আটকে আসে। এতক্ষণ প্রতাপের হাতদু'টো নিজের গলা থেকে সরানোর প্রাণপণ চেষ্টা করছিল সে। আর পারে না লড়াইটা চালিয়ে নিয়ে যেতে। ধীরে ধীরে কুমুদ নিস্তেজ হয়ে যায়।

Chapter 9 (Last Part) Chapter 7