পতির পুণ্যে সতীর পুণ্য পর্ব ৯| A Wife's Virtue is In Husband's Virtue Chapter 09


 

কুমুদ নিস্তেজ হয়ে পড়লেও কুমুদের শরীর নিস্তেজ হয় না, সটান দু'চোখ খুলে তাকায়। কুমুদের চোখদু'টো দেখে প্রতাপ চমকে ওঠে। মণিবিহীন সাদা সে চোখ। প্রতাপের দু'হাত চেপে ধরে কুমুদ, সেই হাত পাথরের মতো কঠিন আর তেমনই বরফের মতো ঠান্ডা। ধীরে ধীরে উঠে বসে প্রতাপের হাতদু'টো নিজের গলা থেকে সরিয়ে দু'পাশে সোজা করে মেলে ধরে, তারপর পিছনদিকে বেঁকাতে থাকে। মট করে আওয়াজ হয়, প্রতাপ আর্তনাদ করে ওঠে।



ওই শুনে কুমুদের শ্বাশুড়ি মা তার পা ছেড়ে দিয়ে দৌড়ে আসে। কুমুদের ওরকম রূপ দেখে ভয়ে চিৎকার করে সেখান থেকে দৌড় দেয়। কুমুদ প্রতাপের দু'হাত সম্পূর্ণভাবে পেছনদিকে বেঁকিয়ে দেয়। প্রতাপ যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকে। কুমুদ একহাতে প্রতাপের গলা চেপে ধরে তাকে শূন্যে উঠিয়ে নেয়। পা বাড়ায় কনকের ঘরের দিকে।


কনককে বুকে জড়িয়ে টগর কুমুদকে দেখে সিঁটিয়ে যায় ভয়ে। শরীর কুমুদের, কিন্তু কুমুদ নয়। দু'চোখ সাদা, চেহারা ফ্যাকাশে, কালচে রঙের শিরা উপশিরা প্রকট হয়ে উঠেছে, পরনের পোশাক ভিজে, চুল থেকে জল ঝরছে। কুমুদ একহাতে প্রতাপকে ধরে এগিয়ে আসতে থাকে। তারপর খাটের পাশ থেকে অন্যহাতে জগদীশের গলাটা ধরে তাকে উঠিয়ে নেয়। ধীরে ধীরে ঘরের বাইরে বেরিয়ে যায়।


জগদীশ আর প্রতাপ, দু'জনকে দু'হাতে ধরে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে থাকে কুমুদ। দোতলা থেকে তিনতলায় পৌঁছায়, তারপর চারতলার ছাদে। জগদীশ সংজ্ঞাহীন, প্রতাপ কুমুদের হাত ছাড়ানোর জন্য ছটফট করছে। ছাদ থেকে দু'জনকে ছুঁড়ে ফেলে দেয় কুমুদ। নীচে বাড়ির সামনে পড়ে থাকে দু'ভাইয়ের মৃতদেহ।


গোটা বাড়ি ঘুরে ঘুরে কুমুদ এবার শ্বাশুড়ি মাকে খুঁজে বার করে। তার অবস্থাও তার ছেলেদের মতোই হয়। কাজ শেষে কনকের ঘরে প্রবেশ করে সে, জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে। কনককে কোলে নিয়ে টগর কুমুদের কাছে ছুটে যায়। দেখে মেঝের উপর একটা করে জলের ছাপ সিঁড়ি দিয়ে নেমে বাড়ির বাইরে যাওয়ার রাস্তা ধরে বেরিয়ে যাচ্ছে।


ঘুমন্ত কনককে তার ছোট্ট খাটে শুইয়ে দিয়ে নিজে আপাদমস্তক একটা চাদরে ঢেকে কাপড়ের মধ্যে করে সেই পেতলের ফুলদানিটা নিয়ে দৌড় দেয় টগর, যেটা দিয়ে কুমুদ জগদীশের মাথায় আঘাত করেছিল। প্রাণপণে ছুটতে থাকে, ছুটতে থাকে। গ্রাম পেরিয়ে যায়। অনেকটা দূরে গিয়ে একটা খালের জলে ফুলদানিটা ছুঁড়ে ফেলে দেয় সে। বাড়ি ফিরে আসে।


টগর বহু চেষ্টায় কুমুদের জ্ঞান ফেরায়। কুমুদ বুঝতে পারে সেদিন সে কানি বউয়ের সামনে অজ্ঞান হয়ে গেলেও তার সঙ্গেই কানি বউ হাজির হয়েছে এখানে। কাজ সমাপ্ত করে ফিরে গেছে আবার। কুমুদ আর টগর নিজেদের মধ্যে শলাপরামর্শ করে। ভোরবেলায় সকলকে খবর দেয়। পুলিশ আসে। তদারকিতে জানা যায়, সম্পত্তি সংক্রান্ত বিবাদে দু'ভাই ছাদের উপর তর্কাতর্কি করছিল, সেটা হাতাহাতি অবধি চলে যায়। তাদের মা থামাতে গিয়েছিল। ওই গন্ডগোলের মধ্যে অসাবধানতাবশত ছাদ থেকে পড়ে যায় তারা। প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে বয়ান দেয় কুমুদ আর টগর। পরিচারক পরিচারিকারাও স্বীকার করে যে দু'ভাইয়ের মধ্যে প্রায়ই ঝগড়াঝাঁটি লেগে থাকত।


একবছর অতিক্রান্ত। জগদীশ, প্রতাপ আর তাদের মায়ের মৃত্যুবার্ষিকীর পুজো সংক্রান্ত আচার অনুষ্ঠান সমাপ্ত। কুমুদের জিনিসপত্র গোছগাছও করা হয়ে গিয়েছে। কনককে নিয়ে মেহুলগঞ্জ ছেড়ে চলে যাচ্ছে সে। বাড়ি বিক্রির ব্যবস্থা এবাড়ির খাজাঞ্চিমশাই ওরফে টগরের বাবা-ই করে দিয়েছে। ব্যবসা হস্তান্তর করতে সাহায্য করেছে শর্মাজীর ছেলে মণীশবাবু। শহরে বাড়ি কিনেছে কুমুদ, একটা টেলারিংয়ের বেশ বড়সড় দোকানও কিনেছে। কয়েকটা অনভিপ্রেত ঘটনা আর এই একটা বছর কুমুদকে অনেকখানি বড়ো করে দিয়েছে, সঠিকভাবে বিচার বিবেচনা করতে শিখিয়েছে।


বিদায়ের সময় দু'খানা বড়ো বড়ো বাক্স নিয়ে টগর আসে, সঙ্গে আসে তার বাবা। কুমুদকে বলে, "আমার মেয়েটাকে সঙ্গে রাখলে তোমার কী খুব অসুবিধে হবে মা?"
কুমুদ বলে, "না না, ছি ছি, এ কী বলছেন! অসুবিধে হতে যাবে কেন! ও ছাড়া আমার এতো কাছের লোক, এতো আপনার লোক কে-ই বা আছে। যাদের সাথে আমার রক্তের সম্পর্ক তাদের চেয়ে অনেক অনেক বেশি করেছে টগর আমার জন্য।"


"তাহলে তুমি ওকে নিজের সঙ্গে নিয়ে যেতে পারবে মা? তোমার সব কাজে ও সাহায্য করে দেবে।"
"কিন্তু খুড়োমশাই, ও চলে গেলে তো আপনি আর খুড়িমা একা হয়ে পড়বেন।"
ম্লান হাসে টগরের বাবা, "না মা, আমরা নিশ্চিন্ত হবো যে আমাদের মেয়েটা ভালো আছে, শান্তিতে আছে। এ গাঁয়ের রীতিনীতি তো তুমি জানোই। আমার এই একখানাই মেয়ে। আমি নিজের জন্য এখানকার নিয়ম মানিনি বলে সকলে আমাদের একটা সময়ে একঘরে করে দিয়েছিল। হিসেবের কাজ ভালো জানতাম, তাই এবাড়ি থেকে ডেকে পাঠিয়েছিল আমাকে। তখন সকলে মেনে নেয়। কিন্তু আমার মেয়ের বেলায় কী আর সেরকম হবে! তাই মা, তুমি ওকে নিজের সঙ্গেই নিয়ে যাও।"


টগরের বাবার জন্য খারাপ লাগলেও খুশিই হয় কুমুদ। অচেনা শহরে একজন সঙ্গীর বড়ো দরকার ছিল তার। টগরের বাবাকে প্রণাম করে বলে, "আপনারা একদম চিন্তা করবেন না খুড়োমশাই। টগর আমার কাছে ভালোই থাকবে। আপনারা যখন ইচ্ছে চলে আসবেন, চাইলে থেকেও যেতে পারেন আমাদের সঙ্গে।"
খাজাঞ্চিমশাই কুমুদের মাথায় হাত রেখে প্রাণ ভরে আশীর্বাদ করে তাকে। টগর আর কনককে নিয়ে কুমুদ নতুন জীবনের দিকে পা বাড়ায়।



আলো ঝলমল বিবাহমণ্ডপে হাস্যোজ্জ্বল বর কনে, অতিথি সমাগমে বিবাহবাসর পরিপূর্ণ। বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে বর ও কনেকে নিয়ে যাওয়া হয় সুসজ্জিত একটা ঘরে। এক বয়স্কা বাটিতে করে মিষ্টি নিয়ে আসেন। নির্দেশ দেওয়া হয় সেই বাটি থেকে বর কনেকে মিষ্টি খাওয়াবে, তারপর কনে বরকে মিষ্টি খাওয়াবে।


বাটি নিয়ে যাওয়ার সময় সেই বয়স্কা কনেকে আশীর্বাদ করে, "সোয়ামি সন্তান নিয়ে সুখে সংসার কোরো দিদিভাই, সোয়ামিকে যত্নআত্তি কোরো। মনে রেখো পতির পুণ্যে সতীর পুণ্য।"
"না মা.." এগিয়ে আসে কনের মা। সেই বয়স্কাকে বলে, "যে যার পাপ পুণ্যের ভার তার নিজের।"
তারপর মেয়ে জামাইয়ের দিকে ফিরে বলে, "চল, এবার খাওয়াদাওয়া করে নাও। সারাদিন তো কেউ কিছু খাওনি।"


টগর এসে কনের মাকে বলে, "বৌমণি, তুমিও খেয়ে নেবে চলো। মেয়ে খায়নি বলে তুমিও তো কিছু খাওনি।"
পাশ থেকে টগরের মেয়ে বলে ওঠে, "আমি কিন্তু কনকদিদির পাশে বসবো মা। কনকদিদির একপাশে জামাইবাবু, আরেকপাশে আমি।"


নতুন কনে, কনক, হেসে বলে, "আচ্ছা বসবি, চল এবার।"
সকলে চলে যায়। সেই বয়স্কা মিষ্টির বাটি হাতে দাঁড়িয়ে থাকে। এক সন্ধ্যের কথা মনে পড়ে যায়, সেদিনও এমন বিয়ের মণ্ডপ ছিল। নিজের নববিবাহিতা নাতনির মধ্যে দেখতে পায় এক সপ্তদশীকে, তারই মেয়ে কুমুদ।
কুমুদ এসে বয়স্কাকে বলে, "খেতে চলো মা।"


সেই বয়স্কা, সনকা, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, "আমাদের জন্য সোয়ামি সন্তান নিয়ে তোর ঘর করা হলো নারে কুমুদ।"
কুমুদ হেসে বলে, "না মা, স্বামী নিয়ে ঘর করতে না পারলেও কোনো আক্ষেপ নেই আমার মনে। কেন জানোতো? কারণ সন্তানসুখ থেকে আমি বঞ্চিত হইনি। কনক তো আমারই মেয়ে।"


বিয়ের অনুষ্ঠান মিটে গেলে নমস্কারির শাড়িগুলো একে একে সকলকে দিতে থাকে কুমুদ। চোখ পড়ে একখানা লাল পেড়ে শাড়িতে, আলাদা করে রাখে।
সনকা শুধোয়, "কার জন্য রাখলি ওটা?"
কুমুদ বলে, "আছে একজন। আমাদের উপর তার অনেক ঋণ।"


বেশ কিছুদিন পর যমুনার শ্বশুরবাড়ির গাঁয়ের উদ্দেশ্যে কুমুদ রওনা দেয়। কানি বউয়ের পুকুরঘাটে গিয়ে হাজির হয়। আগেরবারের মতো আর তাকে ডাকে না। পুকুরঘাটের ভাঙাচোরা সিঁড়িতে বসে থাকে চুপ করে।
খসখস শব্দ হতে দেখে ভিজে অবয়বে কানি বউ দাঁড়িয়ে আছে। কুমুদ কিছু বলে না। দুই নারী পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকে, হয়তো বুঝে নিতে চেষ্টা করে পরস্পরের জীবনসংগ্রাম। কিছুক্ষণ পর কুমুদ কথা বলে, বাড়িয়ে ধরে সেই লাল পেড়ে শাড়ি।


"আমার মেয়ের বিয়ে ছিল, তারই তত্ত্বের নমস্কারির শাড়ি। আমার মেয়ের জীবনে যাদের আশীর্বাদ রয়েছে এ শাড়ি তাদের জন্যই। তাই এটা তোমার জন্য আনলাম। তুমি আমার মেয়েকে আশীর্বাদ কোরো।"
সেই প্রেতিনী এগিয়ে আসে, কুমুদের হাত থেকে শাড়ি গ্রহণ করে। তারপর ফিরে যেতে থাকে। কুমুদ বলে, "তোমার জন্য যদি কিছু করতে পারতাম.."


কানি বউ ফিরে দাঁড়ায়, হাত দিয়ে উপরের দিকে নির্দেশ করে। তারপর চলে যায়। কুমুদ বুঝতে পারে না যে কী বলতে চাইল। সেই রাতটা যমুনার বাড়িতে কাটায় কুমুদ, সারারাত ধরে চিন্তা করে। অবশেষে সেই ইশারার অর্থ উদ্ধার করতে পারে।



ট্রেন ছুটে চলেছে আপন গতিতে। আনমনে বাইরের দিকে তাকিয়ে কুমুদ। পাশে বসে সনকা আর কনক বকবক করেই চলেছে। কুমুদ গয়ায় যাচ্ছে, কানি বউয়ের পিন্ডদান করতে। তার মুক্তি ঘটবে। সেদিন উপরের দিকে ইশারা করে সেই কথাই বোঝাতে চেয়েছিলো সে। যমুনার বাড়ি থেকে ফেরার সময় কানি বউয়ের ব্যাপারে সব খোঁজখবর নিয়ে এসেছে কুমুদ। তার নাম সুভদ্রা। এমনই অদৃষ্ট, মরার পরেও সকলে তাকে "কানি বউ" নামেই চিনে গেলো।


ফেরার পথে ট্রেনে এক ভদ্রলোক কুমুদকে বলেন, "কিছু মনে করবেন না, একটা কথা জিজ্ঞাসা করছি। আপনার নাম কী কুমুদ?"
কুমুদ বিস্মিত হয়, "হ্যাঁ। কিন্তু আপনি জানলেন কীকরে?"
"আমায় আপনি চিনতে না পারলেও আমি কিন্তু আপনাকে চিনতে পেরেছি। আমি মণীশ শর্মা, চিনতে পারছেন এবার? মেহুলগঞ্জে গিয়েছিলাম।"
"আরে, হ্যাঁ হ্যাঁ, তাইতো.."


কিছুক্ষণ কথা বলার পর ভদ্রলোক ধূমপান করার উদ্দেশ্যে ট্রেনের দরজার কাছে এসে দাঁড়ান। কনকও আসে পিছু পিছু।
"আঙ্কল, একটা কথা জিজ্ঞাসা করছি। রাগ করবেন না তো?"
"না না, রাগ করবো কেন? বলো কী বলবে।"
"আপনার বিয়ে হয়ে গেছে?"
"কেন বলোতো?"
"না, এমনি। আসলে তখন গল্প করছিলেন, সেসব শুনে মনে হলো আপনি একাই থাকেন।"
ভদ্রলোক হাসতে থাকেন।



"ঠিকই ধরেছো, বিয়ে করা আর আমার হয়ে উঠলো না। ব্যবসার কাজ করে করেই সময় পেরিয়ে গেলো, আর যখন খেয়াল হলো তখন বুঝলাম এখন আর কেউ আমাকে বিয়ে করবে না। তা তোমার সন্ধানে আছে নাকি কোনো পাত্রী?"


কনক মুচকি হাসে, "আছে, তবে রাজি হতে অনেক সময় নেবে।"
ভদ্রলোক হেসে বলেন, "হুমম, বুঝেছি। সময় নিক, আমার কোনো তাড়া নেই।"
কনক ফিরে আসে সনকার কাছে। ফিসফিসিয়ে বলে, "দিম্মা, তোমার মেয়ের বিয়ের জন্য পাত্র দেখে এলাম। কথাবার্তা কিছুটা এগিয়ে এসেছি, বেশ ভালোই, বুঝলে?"


সনকা অবাক হয়, "ওরে মেয়ে, তোর পেটে পেটে এত!" তারপর কুমুদের দিকে আড়চোখে চেয়ে নিয়ে বলে, "তবে তোর মা যা ঢ্যাঁটা মেয়েমানুষ, রাজি হলে হয়!"
কনক হাসতে হাসতে বলে, "তুমি তো আছো, মায়ের মা। মেয়েকে সামলাতে পারবে না!"
কুমুদের কানে এসব কিছু ঢোকে না। হাওয়ায় তার কপালের চুলগুলো এলোমেলো হয়ে যেতে থাকে। তার মনোযোগ নিবদ্ধ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের "অরক্ষণীয়া" উপন্যাসের পাতায়।
(সমাপ্ত)

Chapter 08