পতির পুণ্যে সতীর পুণ্য পর্ব ১| A Wife's Virtue is In Husband's Virtue Chapter 01



 "হারানের বউ ওর বরের গলা কেটে দিয়েছে.."

ঊর্দ্ধশ্বাসে রান্নাঘরে ঢুকে কথাটা বলে মিনতি। সাথেই হাঁফাতে থাকে। সনকাদের বাড়ি থেকে কিছুটা দূরেই ওদের বাড়ি। পুকুরে বাসন মাজতে গিয়ে বা কলে জল এলে সেখানে দাঁড়িয়ে সুখ দুঃখের সব গল্পই হয়। একজন কোনো খবর পেলে অন্যজনেরও সে খবর অজানা থাকে না।


সনকা ঘ্যাস ঘ্যাস করে থোড় কাটছিল। গোপাদের বাগানের গাছের, ওরাই ডেকে কিছুটা দিল সনকাকে। এর সাথে একটু ডাল রেঁধে নিলেই চলে যাবে। সঙ্গে নাহয় দু'টো বেগুন ভেজে নেবে।


একমনে কাজ করছিল, এমন সময় মিনতির এই খবর। মুহূর্তখানেক কিছু ঠাহর করতে পারে না সনকা। থোড় কাটা থামিয়ে মিনতির মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে।


মিনতি আবার বলে, "হারানের বউটা রে, মালা, বুঝতে পেরেছিস? দা এর কোপ মেরেছে হারানের গলায়। সে যা রক্তারক্তি কাণ্ড কী বলবো! মালার শাড়ি রক্তে মাখামাখি হয়ে আছে। ওভাবেই বসে আছে তখন থেকে। ওর ছোটছেলেটা দৌড়ে এসে খবর দিল। ওদের বাড়ি এখন লোকে লোকারণ্য।"


সনকার তবুও বোধগম্য হয় না। মালা! মালা এমন করবে! বরাবরের শান্ত নিরীহ প্রকৃতির মানুষ সে। কোনো ঝগড়াঝাঁটি, তর্কাতর্কিতে সে থাকে না। পাড়ার কলে জল এলে লাইন দেওয়া নিয়ে বালতি হাতে সবাই কোন্দল শুরু করলেও সে এসব থেকে দূরেই থাকে। যখন নেওয়ার পালা আসে, জল নিয়ে বাড়ি চলে যায়। কম কথার মানুষ। কোনো কোনো দিন ঘাটে বাসন মাজতে গিয়ে দেখা হয়ে যায় সনকাদের সঙ্গে। সেখানে সমালোচনার আসর বসলেও মালা অংশ নেয় না তাতে। কেউ কিছু বললেও চুপচাপ শুনে যায়, সঙ্গে মৃদু হাসে। সে এমন কাজ করবে!


"তুই ঠিক বলছিস?" সনকা জিজ্ঞাসা করে।
"অবাক করলি! এমনতর কথা বানিয়ে বলবো! যা না, দেখ না বাইরে গিয়ে। ওদের বাড়ির সামনে দাঁড়ানোর জায়গা নেই। হইহই শুনতে পাচ্ছিস না?" হাতমুখ নেড়ে বলে মিনতি।


থোড়টা নামিয়ে রেখে কোমরে আঁচল গুঁজে দৌড় দেয় সনকা, পেছন পেছন মিনতিও। কুমুদ তার ছোটবোনের সঙ্গে রান্নাবাটি খেলছিল। মায়ের কথা ঠিকমতো কিছু শুনতে না পেলেও বুঝতে পারে বিষম কিছু একটা ঘটেছে, বিশেষ করে দা এর কোপ মারা শুনে। বোনকে খেলতে বলে সেও মায়ের পিছু নেয়।
সত্যিই হারানদের বাড়িতে তিল ধারণের জায়গা নেই। পুলিশও এসে গেছে। উঠোনে চাদরে ঢাকা মৃতদেহ। হারানের মা আছাড়ি পিছাড়ি খেয়ে কাঁদছে। হারানের ভাইয়ের বউ বাচ্চাগুলোকে ভুলিয়ে ভালিয়ে বাড়ির ভেতরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। অতো লোক, পুলিশ এসব দেখে তারাও সেখান থেকে যাবে না।


কৌতূহলী চোখে মালাকে খোঁজে মিনতি। ওইতো বসে আছে, সামনের দিকে তাকিয়ে, শূন্যদৃষ্টি। শাড়িতে রক্ত ভর্তি। সোয়ামির রক্ত! ভাবতেই মনে মনে শিউরে ওঠে সনকা। মহিলা কনেস্টেবল এসে হারানের ভাইয়ের বউকে কিছু একটা বলতে সে ঘরের মধ্যে চলে যায়, পরক্ষণেই ফিরে আসে একখানা গোলাপী সবুজ ফুলছাপ শাড়ি নিয়ে।


মহিলা কনেস্টেবেল আর হারানের ভাইয়ের বউ দু'জনে মিলে ধরে ধরে মালাকে ঘরের ভেতর নিয়ে যায়। আশেপাশের লোক অনেকে অনেক কথাই বলছে। কিছুক্ষণ থাকার পথ সনকা বাড়ির পথ ধরে। অগত্যা মিনতিকেও সঙ্গ নিতে হয়, যদিও তার এতো তাড়াতাড়ি ওখান থেকে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু মিনতির দাঁড়ালে চলবে কেন। তার এখনও ঘরের কাজ বাকি, রান্নাবান্না বাকি।


ফিরতে গিয়ে হঠাৎই চোখ পড়ে, ভিড়ের মধ্যে কুমুদ দাঁড়িয়ে। সনকা এগিয়ে গিয়ে চেপে ধরে তাকে।
"তুই এখেনে কী করছিস?"
"কী হয়েছে মা এখেনে?"
"কিচ্ছু হয়নি। তুই এসছিস কেন?"
"তোমরা ওভাবে ছুটে চলে গেলে, তাইতো আমি এলাম। কী হয়েছে? পুটুদের বাড়িতে এতো লোক কেন?
"বাড়ি চল আগে। তারপর তোর মজা দেখাচ্ছি.." বলে মেয়ের হাত ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে হাঁটা মারে সনকা।


হাঁটতে হাঁটতে মিনতিকে বলে, "আমি তো ভাবতেই পারছি না মালা অমন করতে পারে!"
"আমিও কী ভাবতে পেরেছিলাম! মাগী কতো দরদই না দেখাতো সোয়ামির উপর। এই ব্রত করছে, ওই উপোস করছে, সেই মন্দিরে পুজো দিচ্ছে। আর এইসব দেখে শুনে আমার শ্বাশুড়িটা তো উঠতে বসতে আমায় জ্বালিয়ে মারতো। নে এবার! সোয়ামির ধড় মুন্ডু আলাদা করে দিয়েছে.."
"পুটুর মা ওর বাবাকে মেরে ফেলেছে?" ফস করে প্রশ্ন করে বসে কুমুদ।


সনকা মিনতি পরস্পরের দিকে তাকায়। সনকা মেয়েকে দাবড়ানি দিতে যাওয়ার আগেই মিনতি কুমুদের দিকে এগিয়ে আসে।


"হ্যাঁরে কুমুদ, তুই পুটু এরা তো সব একসঙ্গে খেলতিস। পুটু কখনও কিছু বলেছে যে ওর বাবা মায়ের মধ্যে ঝগড়া হয়?" কৌতূহলী হয় মিনতি।
"না, সেরকম তো কিছু বলেনি।"


সনকার পছন্দ হচ্ছিল না মিনতি কুমুদের সঙ্গে এসব কথাবার্তা বলতে। একটা এগারো বছরের মেয়ে, তার সামনে এসব কথা বলা মোটেও ঠিক নয়। সে এসবের বুঝবেটা কী!
"চল রে, দেরি হয়ে যাচ্ছে। ওদিকে আবার রান্না চাপাতে হবে।" সনকা তাড়া মারে মেয়েকে।
"তবে জানো তো.." যেতে গিয়েও কুমুদ থমকে দাঁড়ায়।


এবার সনকাও কিছুটা কৌতূহলী হয়। কুমুদ কি জানে কিছু? পুটু কি কিছু বলেছে তবে?
"পুটু অনেকদিন আগে বলেছিল ওর বাবা নাকি আবার বিয়ে করবে বলেছে। বলতো ওদের মামারবাড়ি চলে যেতে, শুধু ওর ভাইটাকে রেখে যেতে। ওর মা যেতে চায়নি, তাই ওর মাকে খুব মারতো। পুটু আটকাতে গেছিল বলে ওর গলা টিপে ধরেছিল হারানকাকা।" বলে কুমুদ।


সনকার আর মিনতির আকাশ থেকে পড়ার দশা হয়।
"সেকি রে! এতোদিন বলিসনি তো কিছু!" সনকা মেয়েকে বলে।
কুমুদ আর কী বলবে, চুপ করে থাকে। তারপর বলে, "পুটু বলেছিল ওর বাবা নাকি ওর মাকে বলেছে, তোমার শরীর আর আমায় টানে না।"
এবার সনকা আর মিনতি অস্বস্তিতে পড়ে যায়।
"ওসব কথা থাক। বাড়ি চল।" সনকা তাড়া মারে।


দুপুরে খেতে বসে কানাইয়ের কাছে সকালের ঘটনার কথা তোলে সনকা। ভাতের গ্রাস মুখে নিয়ে কানাই বলে, "ওসব নষ্ট মেয়েছেলে। ওর ফাঁসি হবে।"
এতোদিন ধরে যার পতিভক্তির প্রশংসা লোকের মুখে মুখে ঘুরতো, এমনকি কানাইও কতোবার তারিফ করেছে মালার, সনকার মাঝেমধ্যে ঈর্ষাও হতো বেশ, স্বামীর মুখে অন্যের বউয়ের এতো প্রশংসা শুনে, তাকে আজ কতো সহজে অবলীলায় কানাই বলে দিল "নষ্ট মেয়েছেলে"। সনকার কেমন একটা ধাক্কা লাগে যেন।


একটু চুপ করে থেকে বলে, "কুমুদ বলছিল পুটু ওকে অনেকদিন আগে বলেছিল ওর বাবা নাকি আবার বিয়ে করবে বলেছে, ওদের মা মেয়েকে বিদেয় হয়ে যেতে বলেছে। যায়নি বলে ওর মাকে খুব মারতোও।"
খাওয়া থামিয়ে কানাই সনকার দিকে তাকায়, "তো? তাই বলে সোয়ামিকে মেরে ফেলবে! এ আবার কেমন বউ!"


"দেখো, আসলে কী হয়েছিল তা তো কেউ জানি না। হারান নাকি এও বলেছিল মালার শরীর তাকে আর টানে না।" বলে সনকা।


"তাহলে তো হয়েই গেল। আবার বিয়ে করবে না তো কী করবে! আরে বাবা, আমরা হলাম গিয়ে পুরুষমানুষ। বউ একটু ডাগর না হলে ঘরে মন টেঁকে কখনও!"


সনকা চুপ করে শুনে যায়। সত্যি, বউকে তো ডাগর হতেই হবে। মানুষের কোনো বৈশিষ্ট্য থাকলে চলবে না। বয়স হওয়া যাবে না, চামড়া কুঁচকানো যাবে না, চুলে পাক ধরা চলবে না, মরার আগে পর্যন্ত ভরা যৌবন থাকতে হবে। সম্বিত ভাঙ্গে নিজেরই দীর্ঘশ্বাসে। শোনে কানাই বলে যাচ্ছে, "....আর শোনোনি? পতির পুণ্যে সতীর পুণ্য। সোয়ামিকে যত্নআত্তি করাই বউয়ের ধম্ম। বুঝলে?"


কুমুদ পাশের ঘরে থাকলেও সব কথাই আসতে থাকে কানে।  বিকালে খেলতে যাওয়ার সময় ঘর থেকে বেরোতে গিয়ে বাবার দিকে চোখ পড়ে যায় তার। তক্তপোষে শুয়ে বাবা ঘুমোচ্ছে। একঝলক দেখে চলে যেতে গিয়েও কুমুদ ঘুরে তাকায়। আঁতকে ওঠে। বাবার গলা বরাবর কাটা দাগ! যেন কেউ দা এর কোপ মেরেছে! আর্তনাদ করে ওঠে কুমুদ।

Chapter 2