কুয়ো ।। The Well



নিকিতার বিয়ের পর এবার প্রথম দুর্গাপুজো।দুর্গাপুজো নিয়ে নিকিতার ছোট থেকেই খুব বেশি উচ্ছ্বাস।পুজোর মাস কয়েক আগে থেকেই জামা কাপড় কেনা,পোশাকের সাথে মানানসই গয়নাগাটি কেনা শুরু হয়ে যায় নিকিতার।পুজোয় কোনদিন কি পড়বে  তাই নিয়ে পরিকল্পনা চলে বহুদিন ধরেই।একটু বড় হতেই কবে কার সাথে ঠাকুর দেখতে যাবে সেটাও ঠিক করতে হত।সপ্তমী বন্ধুরা,অষ্টমী বাবা মা,নবমী মাসির বাড়ির পুজোয় যাওয়া-এইভাবেই কেটে যেত পুজোটা।তবে নিকিতা ঠিক করেছে বিয়ের পর প্রথম পুজোটা বরের সাথেই কলকাতার সব মণ্ডপ চষে ফেলবে।



কিন্তু বিয়ের পরের প্রথম পুজোটা কলকাতার ঠাকুর দেখা হলনা নিকিতার।নিকিতার স্বামী মলয়ের মামার বাড়ি বর্ধমানের এক গ্রামে।মলয়ের দিদিমা বয়সের ভারে অসুস্থ তাই নাতির বিয়েতে আসতে পারেননি।তাই তিনি নাতির কাছে আবদার করেছেন পুজোর ছুটিতে নাতি যেন নতুন বৌকে নিয়ে মামার বাড়ি একবার যায়।মলয়ের মামার বাড়িতে দুর্গাপুজো হয়।তাই এবারের পুজোটা নাতি নাতবৌ এর সাথে কাটানোর ইচ্ছে দিদিমার।মলয় জানে পুজো নিয়ে নিকিতার অনেক পরিকল্পনা তাই একটু ইতস্তত করেই কথাটা বলেছিল নিকিতাকে।নিকিতার মন একটু খারাপ হলেও উপায় তো নেই।বয়স্ক মানুষ-এত করে বলেছেন।অগত‍্যা পঞ্চমীর দিন বিকেলে একটু মনখারাপ নিয়েই নিকিতা ট্রেনে চেপে বসল মলয়ের সাথে।



কিন্তু ট্রেন কিছুদূর যেতেই নিকিতার মনের ভাব আমূল বদলে গেল।কলকাতার কোলাহল ব‍্যস্ততা ফেলে ট্রেন এগিয়ে চলল।শরতের নীল আকাশ,সোনাঝরা রোদ,সাদা মেঘ আর দুপাশে সাদা কাশফুলে ঢাকা মাঠ নিকিতাকে যেন বলল-আকাশ ছোঁওয়া মণ্ডপ,জনসমুদ্র আর থিমের প্রতিযোগিতা ছাড়াও পুজো আসে।সেই পুজোয় দেবী সেজে ওঠেন কাশ ফুলের গয়নায়,নীল আকাশকে দেহে জড়িয়ে নেন শাড়ির মত,সাদা মেঘ মুকুট হয়ে শোভা পায় তাঁর মাথায়।



নিকিতারা ষ্টেশন থেকে নেমে আবার ট্রেকারে চড়ল।যখন পৌঁছল তখন গ্রামের দিকের হিসেবে ভালোই রাত।মলয়ের মামার বাড়িটা বিশাল। বাইরে থেকে অন্ধকারে নিকিতা ভালো দেখতে পেলনা তবে বুঝতে পারল যে এককালে এরা জমিদার গোত্রীয় কিছু ছিলেন।রাত হয়ে যাওয়ায় দিদিমার সাথে দেখা হলনা।দিদিমা ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন।মলয়ের নিজের দুই মামা মামী ছাড়াও রয়েছেন জেঠতুতো খুড়তুতো মামা মামীরা।কেউ কেউ এখানে থাকেন,কেউ আবার পুজো উপলক্ষে এসেছেন।সবাই নতুন বৌকে খুব আদর যত্ন করলেন।



বিরাট বাড়ির অগুন্তি ঘরের মধ‍্যে একটা বরাদ্দ হল নিকিতাদের থাকার জন‍্য।অনেকক্ষণ ধরে চেপে রাখা অস্বস্তিটার কথা রাতে নিকিতা মলয়কে বলেই ফেলল।

-জানো তো এই বাড়িটায় এসে থেকে আমার যেন কেমন একটা মনে হচ্ছে।যেন আমি আগেও এখানে এসেছি।যেন অনেকদিন আগে আমি এখানে ছিলাম।সবকিছু যেন আমার বড় চেনা।

মলয় বলল-পুরনো দিনের সব জমিদার বাড়িগুলোই এক রকম প্রায়।হয়তো এরকম কোন বাড়িতে আগে গেছ বা কোন সিনেমায় দেখে থাকবে।



নিকিতা আর কিছু বলল না।এতটা এসে দুজনেই ক্লান্ত ছিল তাই একটু পড়েই ঘুমিয়ে পড়ল।পরেরদিন ভোরে উঠেই নিকিতাদের ডাক পড়ল দিদিমার ঘরে।দিদিমার ঘরে ঢুকতে ঢুকতেই নিকিতা শুনতে পেল দিদিমার সাদর সম্ভাষণ -কৈ দেখি আমার নাতবৌ এর মুখটা দেখি।

নিকিতা হাসি হাসি মুখে বলল -এইতো দিদিমা।তোমায় দেখব বলেই তো এলাম।

কিন্তু নিকিতা লক্ষ‍্য করল ওকে দেখেই দিদিমার মুখটা যেন কেমন গম্ভীর হয়ে গেল।নিকিতা একটু অবাক হল।দিদিমার কি তাকে পছন্দ হয়নি।নিকিতার মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল।কিন্তু দিদিমা সামলে নিলেন।নিকিতাকে আদর করে বললেন-কি সুন্দর হয়েছে আমার নাতবৌ।

এরপর সেখানে উপস্থিত মলয়ের মামাতো দুই বোন মিনা আর মিষ্টিকে বললেন- দিদিভাইরা,বৌদিকে বাড়িটা ভালো করে ঘুরিয়ে দেখিয়ে দে।



নিকিতা গেল বাড়ি ঘুরে দেখতে।যতই দেখে ওর মনে হয় যেন সব ই ওর বড় চেনা।এই ঠাকুরদালানে যেন ও আগেও দেখেছে পুজো হতে,এই বারান্দায় যেন ও আগেও ঘুরে বেরিয়েছে,এই বাগানে যেন আগেও ফুল তুলেছে।হঠাৎ নিকিতা মিষ্টিকে জিজ্ঞেস করল-কুয়োটা কোন দিকে?

মিষ্টি একটু অবাক হয়ে বলল-তুমি কি করে জানলে কুয়ো  আছে?কুয়ো তো বহুদিন ব‍্যবহার হয়না।

নিকিতা নিজেও অবাক হয়েছে।কথাটা ওর মুখ দিয়েই বেরিয়েছে সন্দেহ নেই।কিন্তু ওর তো জানার কথা নয় কুয়োর ব‍্যাপারে।কি যে হচ্ছে এসব।মিনা আর মিষ্টি কুয়ো দেখাতে নিয়ে গেল।বাড়ির এককোণে অব‍্যবহৃত কুয়ো।কুয়োর গায়ে শ‍্যাওলার স্তর।কুয়োর মুখটা পাকাপাকিভাবে বন্ধ করা।কুয়োটার কাছে গিয়ে নিকিতা হঠাৎ যেন অসুস্থ বোধ করতে লাগল।চোখের সামনে ঝাপসা লাগতে লাগল সবকিছু।তাড়াতাড়ি সরে এল ওখান থেকে।



বিকেলে মা দুর্গার  বোধন হল।গ্রামে এই একটাই পুজো।তাই গ্রামের সবাই এই পুজোয় আসে।সবারই যেন এটা নিজের বাড়ির পুজো।এত আন্তরিকতা ও সবাই মিলে এই আনন্দ করা দেখে নিকিতার খুব ভালো লাগল।তবে একটা জিনিস একটূ অদ্ভুত লাগল।বিকেলে পুজোর সময় এক বৃদ্ধা এলেন।সবাই তাঁকে খুব সম্মান দিচ্ছিল।তিনি নাকি এই গ্রামের বয়স্কতম মানুষ।মলয়ের দিদিমার থেকেও কিছুটা বড়।নিকিতা তাঁকে প্রণাম করতে তিনি একটু যেন হকচকিয়ে গেলেন।তারপর বললেন-মায়ের লীলা বোঝা আমাদের সাধ‍্য নয়।

এরপর মলয়ের দিদিমার সাথে কিসব কথাবার্তা বললেন আর বারবার নিকিতার দিকে তাকাতে লাগলেন।নিকিতা একটু বিরক্ত হল এই আচরণে।



রাতে খেয়ে নিয়ে শুতে গেল নিকিতা।কাল ভোর ভোর উঠতে হবে।নবপত্রিকাকে স্নান করাতে নিয়ে যাওয়া হবে পুকুরে।ঘুমিয়েই পড়েছিল নিকিতা।হঠাৎ মাঝরাতে ঘুমটা ভাঙল।বাইরে আলো আঁধারীর খেলা চলছে।ঝিঁঝিঁর ডাক ছাড়া কোন শব্দ নেই।পুজোর সময় কলকাতায় এখন আলোয় শব্দে দিন রাতের বিভেদ থাকেনা।আর এখানে কি নির্জন রাত।



নিকিতার ইচ্ছে হল একটু বাইরে যায়।একবার ভাবল নতুন জায়গা,রাতে একা বেরিয়ে লাভ নেই।কিন্তু কি যেন এক আকর্ষণে বেরিয়ে পড়ল।মলয় গভীর ঘুমে অচেতন।বাইরে বেরিয়ে যেন ঘোরের মধ‍্যে হাঁটতে লাগল নিকিতা।কোনদিকে চলেছে ও জানেনা।যখন থামল ও দেখল ও সেই পরিত‍্যক্ত কুঁয়োর কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। হঠাৎ নিকিতার একটা অদ্ভুত অনুভূতি হল।যেন ঐ কুঁয়োর জলে ও ডুবে যাচ্ছে।ও ছটফট করছে ভেসে উঠতে কিন্ত পারছেনা।ও তলিয়ে যাচ্ছে গভীরে আরও গভীরে।ভয়ে ঘেমে উঠছে নিকিতা।ওর পা যেন কেউ মাটির সাথে আটকে দিয়েছে।ও নড়তে পারছেনা।হঠাৎ দূরে একটা রাতজাগা পাখি ডেকে উঠল।তার ডাকে সম্বিত ফিরল নিকিতার।কোন রকমে ছুটে এসে ঘরে ঢুকল।



পরদিন সকাল থেকে নিকিতার হালকা জ্বর এল।মাথাটাও ভার।ও আর গেলনা কলাবৌ স্নান দেখতে।সারাদিন বিশেষ উঠলোও না।রাতে শুয়ে পড়ল তাড়াতাড়ি।মাঝরাতে মলয়ের ঘুমটা ভেঙে গেল।নিকিতার শরীরটা খারাপ সেই চিন্তাতেই হয়তো ঘুমটা ভাঙল নয়তো মলয়ের ঘুম খুব গাঢ়।ঘুম ভেঙে দেখল নিকিতা পাশে নেই।ভাবল হয়তো বাথরুমে গেছে।কিন্ত বেশ কিছুক্ষণ পরও যখন নিকিতা ফিরল না মলয় চিন্তায় পড়ল।প্রথমে নিজে বেরিয়ে আশেপাশে দেখল।যখন পেলনা মামাতো ভাইদের ডাকল।অচেনা জায়গায় একা মেয়েটা অসুস্থ শরীরে গেল কোথায়।



বেশ কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর নিকিতাকে পাওয়া গেল কুয়োর ধারে।সে একমনে তাকিয়ে আছে কুয়োর দিকে।যেন তার কোন দিকে কোন জ্ঞান নেই।মলয় তার নাম ধরে ডাকল।কোন উত্তর নেই।মলয় এগিয়ে গিয়ে নিকিতার পিঠে হাত রাখল।নিকিতার গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে।নিকিতা ফিরে চাইল।চমকে উঠল মলয়।নিকিতার চাহনি উদ্ভ্রান্তের মত।সে যেন এ পৃথিবীর বাসিন্দা নয়।সে বলে উঠল- আমি গয়না নিয়ে পালাইনি।আমার স্বামী গয়না সমেত আমাকে খুন করে কুয়োয় লাশ ফেলে দেয়।কুয়োতে খুঁজে দেখ আমার কথা প্রমাণ হবে।



বলতে বলতে মলয়ের হাতের ওপর ঢলে পড়ল নিকিতার অচৈতন‍্য দেহটা।

পরদিন বিকেল।নিকিতা আজ সকাল থেকে সুস্থ।কাল রাতের কথা তার মনে নেই।মলয় জিজ্ঞেস করে দেখেছে সে কিছুই মনে করতে পারছে না।আপাতত সে ননদ দেওরদের সাথে ঠাকুরদালানে পুজো দেখছে।



দিদিমার ঘরে দিদিমা,মলয় আর মামা মামীরা বসে।সকালে মলয় সব কথা জানিয়েছে সবাইকে।দিদিমা বলছেন আর সবাই শুনছে-এরকম ঘটনা যে হয় না দেখলে বিশ্বাস হতনা।নিকিতাকে প্রথমদিন দেখেই চমকে উঠেছিলাম।একেবারে আমার মেজ জা নমিতার মত দেখতে।সেই মুখ,সেই চাহনি,সেই হাসি।নমিতা গরীব ঘরের মেয়ে।শ্বশুরমশাই নিজের বিপথগামী মেজ ছেলের জন‍্য গরীব ঘরের সুন্দরী মেয়ে নমিতাকে বেছেছিলেন।কিন্তু রূপসী বৌও ছেলেকে সৎ পথে ফেরাতে পারেনি।বৌ এর ওপর আমার মেজ দেওর খুব অত‍্যাচার করত।একদিন সকালে উঠে নমিতাকে দেখা গেলনা।সবাই বলল সে বাক্স ভর্তি গয়না নিয়ে পালিয়েছে।আমি বিশ্বাস করিনি।কিন্ত কে আর আমার কথা শোনে।



কুয়োটা পরিত‍্যক্ত ছিল আগে থেকেই।এর কিছুদিন পর মেজ দেওর নিজের উদ‍্যোগে কুয়োটা বাঁধিয়ে দেয়।কিছুদিন পর অতিরিক্ত মদ‍্যপানের ফলে মেজ দেওরেরও মৃত‍্যু হয়।মেজজা নিঃসন্তান ছিল।অভাগী মেয়েটা বিচার পায়নি।তাই এই জন্মে নিকিতা রূপে ফিরে এসে সবাইকে জানাতে চেয়েছে ওর ওপর হওয়া অবিচারের কথা।



মলয় বলল-কিন্তু কুঁয়োতে তো খুঁজে দেখা হলনা দিদিমা।ওর কথা সত‍্যি কিনা।

দিদিমা বললেন-পুজোটা মিটুক।তোরা কলকাতায় ফিরে যা।তারপর কুঁয়ো থেকে উদ্ধার করা হবে নমিতার দেহ।আমি চাইনা নিকিতা এসব দেখুক।ওর আগের জন্মের দুর্ভাগ‍্য এ জন্মে যেন ছায়া না ফেলে।নমিতাকে যেন নিকিতা ভুলে থাকতে পারে।ওকে আর কোনদিন এ বাড়িতে আনিসনা দাদুভাই।আর আগের জন্মে মেয়েটা যত দুঃখ পেয়েছে এ জন্মে ওকে তার থেকে অনেক গুণ বেশি সুখে ভরিয়ে রাখিস।



একাদশীর দিন মলয় আর নিকিতা ফিরে এল।মাঝের দিনগুলো নিকিতা বেশ আনন্দেই কাটিয়েছে।ফেরার দিন দুয়েক পর বড়মামা মলয়কে ফোনে জানালেন পাওয়া গেছে একটা কঙ্কাল যার গা ভর্তি সোনার গয়না।মলয় নিকিতাকে এসব কথা কিছুই জানায়নি।শুধু মনে মনে বলেছে-আগের জন্মে তুমি অনেক যন্ত্রণা পেয়েছ। এ জন্মে যাতে শুধুই আনন্দ পাও সেই ভার আমার।